অর্থনীতিতে ক্রয়ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভোক্তার যদি ক্রয় করিবার সামর্থ্য না থাকে, তাহা হইলে অর্থনীতির সচল বৃত্তে ছেদ পড়ে। এই জন্য ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপারে পুঁজিবাদী অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়া থাকে। কিন্তু করোনার কারণে সারা বিশ্বেই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রভার্টি অ্যান্ড শেয়ারড প্রসপারিটি ২০২০ প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, করোনার কারণে বিশ্বের অতিদারিদ্র্যের হার ৮ হইতে ৯ শতাংশের অধিক হইয়াছে। করোনার জন্য কোটি কোটি মানুষ কাজ হারাইয়া অতিদরিদ্রের খাতায় নাম লিখাইয়াছে। গত আট মাসে করোনার প্রথম ঢেউ ক্রমশ প্রশমিত হইয়াছে, তৃতীয় বিশ্বের মানুষেরা ভাবিতেছে—করোনার কালবেলা ফুরাইল বুঝি! করোনার ভয়ে গৃহবন্দি থাকিলে তো না খাইয়া মরিতে হইবে, ফলে সাধারণ মানুষ করোনা লইয়া আর বিশেষ ভাবিতে চাহিতেছে না। কিন্তু তাহাতেও কি শেষরক্ষা হইবে? ইহা তো বিশ্বগ্রাম। ইউরোপ-আমেরিকা যদি স্থবির হইয়া পড়ে, তাহা হইলে তাহার অভিঘাত তৃতীয় বিশ্বের উপর সবচাইতে বেশি পড়িবে নিঃসন্দেহে। ইতিমধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের তাণ্ডব শুরু হইয়া গিয়াছে ইউরোপ জুড়িয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলিতেছে, আগামী ছয় মাস ইউরোপের সামনে ‘কঠিন’ সময় অপেক্ষা করিতেছে। শীতের শুরুতেই মাত্র এক সপ্তাহেই মহাদেশটিতে ২৯ হাজারের অধিক মানুষ করোনায় প্রাণ হারাইয়াছে।
ইহা ঠিক যে, করোনা মোকাবিলায় অতি দ্রুততার সহিত একাধিক সম্ভাব্য ভ্যাকসিন তৈরি হইয়াছে। কিন্তু, তাহার পরও ইউরোপ তথা সমস্ত বিশ্বকে আসন্ন দিনগুলিতে কঠিন সময় পার করিতে হইবে বলিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এইদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তো করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থতার চরম খেসারত দিয়াছেন লজ্জাকর পরাজয়ের মাধ্যমে। ইউরোপ-আমেরিকার যদি এই অবস্থা হয় এবং আগামী ছয় মাস যদি অতি ভয়াবহতার লাল সতর্কতা জারি করা হয়, তাহা হইলে আমাদের অবস্থা কী হইতে পারে? তৃতীয় বিশ্বের অনেক বড় একটি সমস্যা হইল ‘সমস্যা’কে অস্বীকার করা। তৃতীয় বিশ্বের অনেকের শ্লাঘোক্তি করিয়া থাকেন করোনা মোকাবিলায় অতিরঞ্জিত সাফল্য লইয়া। উন্নত বিশ্বের সাপেক্ষে ইহাকে বলা যাইতেই পারে—ঘটি ডোবে না, নামে তালপুকুর! অথচ যাহারা সমুদ্রসম জলাশয়ের মালিক তাহারা আসন্ন সংকটে কাঁপিতেছেন। প্রকৃত বিপদকে যথাযথভাবে অনুধাবন না করাটাও অনেক বড় বিপদ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথমদিকে যেমন করোনাকে খুব বেশি বিপজ্জনক বলিয়া মনে করে নাই এবং মহামারি ঘোষণা করিতেও অধিক সময় লইয়াছিল। তাহার ফলে সমগ্র বিশ্বে করোনা ছড়াইয়া পড়িতে খুব অধিক সময় লাগে নাই। এইদিকে চলতি অক্টোবরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সাউথ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, করোনাকালে বাংলাদেশে গরিব লোকের সংখ্যা দ্বিগুণ হইয়াছে। দারিদ্র্যের হার সাড়ে ১২ শতাংশ হইতে বাড়িয়া ২২ শতাংশ হইয়াছে। সার্বিকভাবে আয় কমিয়া যাওয়ায় সাধারণ মানুষ আজ সামান্য প্রয়োজনটি সামাল দিতেই হিমশিম খাইতেছে। এমনকি ধনী দেশসমূহও বাড়তি কিনাকাটায় রাশ টানিয়াছে।
সুতরাং এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করিয়া বরং আরো বেশি করিয়া আমলে লইতে হইবে। এমনকি ইউরোপের আসন্ন সংকটে যদি কিছুদিন পর কার্গো বিমান পরিষেবাও বন্ধ হইয়া যায়, তখন কী অবস্থা হইতে পারে—এইরূপ সম্ভাব্য আশঙ্কার কথা মাথায় রাখিয়াই পরিকল্পনা সাজাইতে হইবে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর যদি তৃতীয় ঢেউ আসে! ইহাও ভাবিয়া দেখিতে হইবে। সময় এখন আত্মশ্লাঘার নহে, বরং টিকিয়া থাকার।
