শিশুদের ভবিষ্যত্ গড়তে স্মার্টফোনে আসক্তি ঠেকান

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২০, ২২:০৯

ছয় বছরের ছোট্ট মেয়ে রন্তি। করোনায় স্কুল বন্ধ, বাহিরে বের হওয়াও প্রায় বন্ধ। তাই ঘরে বসে সারা দিন মায়ের ফোনে দিব্যি গেমস খেলে যাচ্ছে। মা হাত থেকে ফোন নেওয়ামাত্রই ভীষণ কান্না শুরু করে দিল। পড়তে বসতে এবং খাবার খেতেও এখন তার ফোন চাই। বলতে গেলে এক ধরনের আসক্তি পেয়ে বসেছে। রন্তির এভাবে স্মার্টফোনে আসক্তি দেখে তার বাবা-মা খুবই দুশ্চিন্তায় আছেন।

এ চিত্র শুধু রন্তির পরিবারের নয় বরং গোটা বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারের। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাতে স্মার্টফোন নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর; কিন্তু যখন ছোট্ট একটি শিশুর হাতে স্মার্টফোন থাকে, তখন তা নিশ্চয়ই অশুভ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়।

শিশুদের মোবাইল ফোন, ট্যাব কিংবা ল্যাপটপে আকৃষ্ট হওয়ার কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়—অভিভাবকরা কর্মস্থল কিংবা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ততার দরুণ শিশুরা মা-বাবার আদর-যত্ন থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত হন। তাই তারা বাচ্চাদের অবসর সময় কাটানোর জন্য ফোন, ট্যাব কিংবা ল্যাপটপ হাতে তুলে দেন। তাছাড়া বর্তমানে খেলার মাঠের যেমন অপ্রতুলতা রয়েছে তেমনি ঘরের বাইরে শিশুদের খেলতে পাঠানোর আগে নিরাপত্তার বিষয়টিও ভাবেন অভিভাবকরা। তাই অনেক অভিভাবকই ঘরে বাচ্চাদের গেমস, কার্টুন দেখে সময় কাটানোকে শ্রেয় মনে করেন। এছাড়াও শিশুর কান্না থামানো কিংবা খাবার খাওয়াতে স্মার্টফোনে গান, কার্টুন বা মজার ভিডিও ছেড়ে দিয়ে তাকে নিমিষেই শান্ত করা হয়। স্মার্টফোনের কল্যাণে শিশুদের শান্ত রাখা, খাওয়ানোসহ বিভিন্ন কাজে অভিভাবকদের স্বস্তি ফিরলেও বিপরীতে শিশুদের মধ্যে এভাবেই বাড়ছে স্মার্টফোনে আসক্তি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারের ফলে বাধাগ্রস্ত হয় শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। গবেষকরা দেখিয়েছেন—স্মার্টফোনে আসক্তি শিশুর কর্মদক্ষতা ও সৃজনশীলতা হ্রাসের পাশাপাশি সৃষ্টি করে দৈহিক ও মানসিক সমস্যার। এতে শিশুদের আবেগ কমে যায়, রাগ ও হতাশা বৃদ্ধি পায়, অনিদ্রার সৃষ্টি হয়, মেজাজ খিটখিটে হয়, ধৈর্য ও মনোযোগ কমিয়ে দেয়, রক্তের চাপ বেড়ে যাওয়া এমনকি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও বহুলাংশে বেড়ে যায়। মোবাইল ফোনের বিকিরণ থেকে চোখের নানা রোগেও আক্রান্ত হয় শিশুরা। ফলে শিশুরা ধীরে ধীরে অসহিষ্ণু, অসামাজিক ও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ে। তার সহজাত সামাজিক গুণাবলির বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। স্মার্টফোনের মাধ্যমে শিশুরা অপ্রাপ্ত বয়সেই না বুঝে বিভিন্ন অনৈতিক ও আপত্তিকর বিষয়বস্তুর সম্মুখীন হয়। আর এতে শিশুদের মধ্যে নৈতিক স্খলন ও সামাজিক অবক্ষয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে হুমকির মুখে পড়ছে শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ, বিপথে ঠেলে দিচ্ছি আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে।

একটি শিশুর সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যত্ গড়তে এবং এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে অভিভাবকদের এখনই সচেতন হতে হবে। সন্তানকে অধিক সময় দিলে; পারিবারিক ও সামাজিক সংযোগ বাড়লে কিংবা সময় করে পার্ক বা কোথাও বেড়াতে নিয়ে গেলে শিশুদের ইলেকট্রনিক মাধ্যমে আসক্তি অনেকটা কমে যাবে। উপযুক্ত বয়সের আগে তাদের হাতে ফোন কম দিতে হবে। মনে রাখতে হবে—স্মার্টফোন ব্যবহারের জন্য অনুপযোগী হলে শিশুদের হাতে কখনোই স্মার্টফোন তুলে দেওয়া যাবে না। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়, সৃষ্টিশীল কর্মে উদ্বুদ্ধ করা যায় এবং ঘরের বাইরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিশুদের খেলাধুলা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে শিশুদের স্মার্টফোনে আসক্তির সমস্যা অনেকটা কমে আসবে। একই সঙ্গে শিশুদের সহজাত সামাজিক গুণাবলি বিকাশিত হবে, মেধা ও মননশীলতা বৃদ্ধি পাবে। শিশুর সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যত্ গড়ে তুলতেও সহায়ক হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়