বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলাচর্চার ইতিহাসে শক্তিমান অথচ বর্তমানে বিস্মৃতপ্রায় শিল্পী মবিনুল আজিম। তার বিস্মৃত হওয়ার পেছনে রয়েছে তার দীর্ঘ সময়ের প্রবাসজীবন এবং অতি অল্প বয়সে হারিয়ে যাওয়া। যে বয়সে তার বন্ধুরা ঢাকায় বসে শিল্পচর্চা করেছেন, সেই বয়সটা তিনি কাটিয়েছেন করাচিতে। করাচিতে তার বেশ নাম-ডাক ছিল। স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকায় ফিরে নতুন উদ্যমে শিল্পচর্চা শুরু করেছিলেন এবং শিল্পবোদ্ধাদের সমীহও আদায় করে নিয়েছিলেন।
মবিনুল আজিমের জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৪ নভেম্বর মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে। তিনি ঢাকার গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস থেকে চারুকলায় ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি কিছুদিন শিল্পকলা বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। মবিনুল আজিম করাচির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ এবং পাকিস্তানের পাকিস্তান-আমেরিকান সেন্টারেও কিছুদিন কর্মরত ছিলেন। শিল্পকলায় শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত থাকলেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছবি আঁকায় একাগ্র ছিলেন। ষাটের দশকে পাকিস্তান-ভারত উপমহাদেশে চিত্রশিল্পের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন মবিনুল আজিম। তিনি এদেশের চিত্রভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন তার সমকালীন চিন্তাভাবনা ও ধ্যানধারণা দিয়ে।
মবিনুল আজিম বাংলার জনপদ, সবুজ বনানি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও তাদের দুঃখ-কষ্টের ছবি এঁকেছেন। তার শিল্প আমাদের নতুনভাবে বাংলার রূপ ও লাবণ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বিমূর্তের প্রতি ঝোঁক ছিল তার। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বিমূর্ত ধারায় মনোনিবেশ করেন। তবে ব্রাশের কারুকাজে তিনি বিমূর্তকে রহস্যময় করে তুলতেন। তার ছবিতে প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিলক্ষিত হয়। ফর্ম, কম্পোজিশন ভেঙে নতুন নতুন রূপ দান করতেন। তার বিমূর্ত ধারার ছবিগুলোতে বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী জ্যাকশন পোলকের প্রভাব দেখা যায়। তবে তিনি তার শিল্পকর্মে নতুন মাত্রিকতা, নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যোগ করেন। মবিনুল আজিমের ছবির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো রঙের বহুবিধ ব্যবহার—রং নিয়ে তিনি খেলেছেন, রঙের মাঝে তিনি বাংলার বিচিত্র প্রকৃতি ও রূপ তুলে ধরতে চেয়েছেন।
মবিনুল আজিমের ছবিগুলো প্রকাশে যতটা বলিষ্ঠ, মেজাজে তত উদার। ছবিগুলোর ভেতরে গভীরতার আহ্বান পাওয়া যায়। তার ছবিগুলোর নিজস্বতা, স্বাতন্ত্র্য আর উত্কর্ষতা তার শিল্পসত্তাকেই অনন্যভাবে তুলে ধরে।
মবিনুল আজিম স্পেসের ব্যবহারে বেশ সতর্ক ছিলেন। বস্তু ও কম্পোজিশনকে খুব যত্নসহকারে উপস্থাপন করতেন স্পেসের ব্যবহার চিন্তা করে। তিনি জীবনঘনিষ্ঠ ছবিকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি মনোনিবেশ করেছেন ফিগার স্কেচিংয়ে। ফিগার বাস্তবধর্মী এবং ফিগারে প্রাণ সঞ্চারে বিশেষ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। তিনি মানব অবয়বকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন, কারণ তিনি আন্তরিকভাবে মানুষকে দেখতেন। তিনি মানুষকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। সে কারণেই মানুষের দুঃখ-কষ্ট, বেদনা, স্বপ্ন ও আনন্দই তার ছবির মূল উপজীব্য।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন শিল্পী মবিনুল আজিম। তখন তিনি চারুকলার দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সহপাঠীদের সঙ্গে দেওয়াললিখন আর পোস্টার তৈরি করতেন। তার চিত্রপটে প্রস্ফুটিত হয়েছে এদেশের সংগ্রামের ইতিহাস। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ছিষট্টির ছয় দফা—সবই প্রাণ পেয়েছে তার তুলির ছোঁয়ায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনন্য অবদান রাখায় বিদেশি সাংবাদিক মার্ক টালিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি সুন্দর পেইন্টিং উপহার দিয়েছিলেন, যা মবিনুল আজিমের আঁকা। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে শিল্পী মবিনুল আজিম বঙ্গবন্ধুর তিনটি পোর্ট্রেট আঁকেন, যার একটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এখনো সংরক্ষিত আছে।
শিল্পী মবিনুল আজিমের জীবদ্দশায় তার ছবির ৫৪টি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি ছিল একক এবং ৩৭টি যৌথ প্রদর্শনী। এর মধ্যে ১৪টি প্রদর্শনী দেশে এবং ৪০টি প্রদর্শনী দেশের বাইরে হয়েছে। তার বেশ কিছু ছবি করাচিতে রয়ে গেছে, যেগুলো পরবর্তী সময়ে আর দেশে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। শিল্পী মবিনুল আজিম ১৯৭৫ সালের ১ নভেম্বর মাত্র ৪১ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। সমকালীন অনেক শিল্পী রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত হলেও নিভৃতচারী এই শিল্পী সেই সম্মানে ভূষিত হতে পারেননি। তিনি রয়ে গেছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। শিল্পী মবিনুল আজিমের মৃত্যুর পর ঢাকা ক্লাব ও শিল্পকলা একাডেমিতে তার একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। শিল্পী মবিনুল আজিমকে আমরা স্মরণ করি মৃত্যুহীন অর্জনের জন্য। স্বল্প জীবনে তিনি যেসব শিল্পকর্ম রেখে গেছেন, তা আমাদের দেশের সম্পদ।
n লেখক :সাংবাদিক
