প্লাস্টিক বর্জ্যে ব্যাহত বরিশাল নৌবন্দরের ড্রেজিং কার্যক্রম

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২০, ২২:৩৭

শুকনো মৌসুমের শুরুতেই বরিশাল নদীবন্দরসহ দক্ষিণাঞ্চলের ১৭টি পয়েন্টে নাব্য সংকট দেখা দেওয়ায় আগেভাগেই ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছিল বিআইডব্লিউটিএ। তবে বরিশাল নদীবন্দর এলাকায় পলিথিন ও প্লাস্টিকের দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করায় ব্যাহত হচ্ছে পলি অপসারণ কার্যক্রম। এদিকে নদীর তীরবর্তী স্থানে কোনো জায়গা না পাওয়ায় অপসারণ করা পলি নদীতেই ফেলতে হচ্ছে।

জানা যায়, ৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কীর্তনখোলা নদী দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। দৈনিক এ বন্দরে প্রচুর সংখ্যক যাত্রীবাহী লঞ্চসহ নৌযানের সমাগম ঘটে। এসব লঞ্চ থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ও পলিথিন যাত্রীরা নদীতে ফেলেন। নদীর তীরবর্তী অবৈধ দখলদারদের গড়ে ওঠা বিভিন্ন দোকান থেকেও বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ও পলিথিন ফেলা হচ্ছে কীর্তনখোলায়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বরিশাল নগরীর বর্জ্য ও পলিথিন যা বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে অবাধেই কীর্তনখোলায় ফেলা হচ্ছে। এসব পলিথিন ও প্লাস্টিকের কারণে ব্যাহত হচ্ছে পলি অপসারণ কার্যক্রম।বরিশাল নদীবন্দর এলাকায় ১ লাখ ৩০ হাজার কিউবিক মিটার পলি বালু ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তেমন সাফল্য নেই। গত ১৫ অক্টোবর শুরু হওয়া এ কার্যক্রমে গতকাল সোমবার পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার কিউবিক মিটার পলি অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।

ড্রেজিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে ঝামেলা এড়াতে নদীর পলি নদীতেই ফেলা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের দাবি বিগত ১০/১২ বছর যাবত্ এভাবেই বাধ্য হয়ে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। কেননা বরিশাল, পটুয়াখালী, বাকেরগঞ্জের কারখানা নদীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজিং করে পলি নদীর তীরে ফেলতে গেলে স্থানীয়দের বাঁধার মুখে পড়ে হচ্ছে। তাই কমপক্ষে ৬০/৭০ ফিট গভীর নদীতে পলি ফেলতে পারলে তা স্রোতের টানে ভেসে যায়।

বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান ভূঁইয়া জানান, ড্রেজিং করে যে পলি অপসারণ করা হয় তাতে ৭০ ভাগ বালু ও ৩০ ভাগ পানি থাকে। শহর এলাকায় নদীর তীরবর্তী স্থানে তা ফেললে স্তূপ হয়ে যায়। এলাকাবাসীর বাঁধার মুখে পড়ে বর্তমানে কীর্তনখোলা নদীসহ বাকেরগঞ্জের কারখানা নদী ও পটুয়াখালীর লোহালিয়া এলাকায় ড্রেজিং করে যেখানে পানির স্রোত বেশি সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, এসব এলাকার নদীর বেশ কিছু স্থানে ৬০/৭০ ফিট গভীরতা রয়েছে তাতে পলি অপসারণ করতে তেমন অসুবিধা হচ্ছে না। তবে কীর্তনখোলা নদী খননে সবচেয়ে বড় সমস্যা নদীতে দূষণ ও নৌ-বন্দর এলাকায় প্রস্তুত করতেই সময় নষ্ট হয়। তিনি জানান, বিরতিহীন ২৪ ঘণ্টা ড্রেজার মেশিন চালালেও বাস্তবে চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি পলি অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে। বরিশাল নগরীর বেশ কিছু পয়েন্ট থেকে সরাসরি আবর্জনা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে পলিথিনসহ নানা বর্জ্য আটকে মেশিন বার বার বন্ধ করতে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে নৌ-বন্দর এলাকায় অতিরিক্ত বর্জ্য থাকায় বার বার পাইপ পরিষ্কার করা হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পর এভাবে পাইপ পরিষ্কার করায় প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছে। নদীবন্দর এলাকাকে কেন্দ্র করে যে সব অবৈধ দখলদাররা বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলেছেন প্রতিদিন তা থেকে প্রচুর পরিমাণ বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। একদিকে ড্রেজিং মেশিন বর্জ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং বার বার তা পরিষ্কার করা হচ্ছে, অপরদিকে নদী তীরের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান সরকার জানান, বর্তমানে ব্যবহূত ওয়ান টাইম প্লাস্টিক সামগ্রী এবং পলিথিন নদীতে ফেলায় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। মাইক্রো প্লাস্টিক ও ম্যাক্রো প্লাস্টিক নদীর মাছ খাদ্য হিসেবে খেয়ে মত্স্য সম্পদ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। একই সঙ্গে ঐ মাছ মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর যা প্রাণঘাতি রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ মানুষদের সচেতন করতে নানা প্রচারণামূলক উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে।

বরিশাল বিআইডব্লিটিএ সূত্র জানায়, বর্তমানে কীর্তনখোলার যে ফোরশোর রয়েছে (নদীর লো ওয়াটার এবং হাই ওয়াটার লেভের মধ্য থেকে ৫০ ফিট নদীর পাড় পর্যন্ত) তার শতকরা ৩০ ভাগও বিআইডব্লিউটিএর নিয়ন্ত্রণে নেই। এই ফোরশোর বিভিন্ন ব্যক্তি নামে-বেনামে বিভিন্ন মহল থেকে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে মালিক সেজে দখল করে আছে। এসব অবৈধ দখলকারীরা নদী দূষণে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

বিআইডব্লিউটিএর বরিশালের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক মো. মুস্তাফিজুর রহমান, বরিশাল জেলায় নদ-নদী ও খাল যৌথ সার্ভের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করার এরই মধ্যে আট সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটি অবৈধ দখলদারদের তালিকার একটি খসড়াও প্রস্তুত করেছে। বর্তমানে ম্যাপ তৈরির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সবকিছু চূড়ান্ত অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামবে বিআইডব্লিউটিএ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক মো. রফিকুল আলম জানান, নদী রক্ষায় বার বার সচেতনতার তাগিদ দেওয়া হলেও কেউ তা মানছে না। বিশেষ করে যাত্রীবাহী লঞ্চ কর্তৃপক্ষ ও যাত্রীরা ইচ্ছেমতো নদীতে পলিথিনসহ বিভিন্ন আবর্জনা ফেলে থাকে। দখলদারদের দৌরাত্মে নদীর তীরবর্তী স্থানে গড়ে ওঠেছে বিভিন্ন অবৈধ প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য নদীতে ফেলা।