এই নির্বুদ্ধিতার অবসান হউক

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২০, ২১:২৩

প্রবাদে আছে, ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দিব কোথা?’ বাংলাদেশের বহু সমস্যার ক্ষেত্রে কথাটি প্রযোজ্য। এতদিন আমরা বুড়িগঙ্গার দখল ও দূষণ নিয়া উচ্চকিত হইয়াছি। কিন্তু সমগ্র দেশে যেই সকল নদনদী রহিয়াছে তাহার অবস্থাও তথৈবচ। শুধু কি বাংলাদেশ, নদী ও সমুদ্রদূষণ আজ কোথায় হইতেছে না? ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশে সমুদ্র হইতে টনকে টন প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য উদ্ধার হইতে দেখিয়া সমুদ্র ও সমুদ্রসম্পদ রক্ষায় বিভিন্ন দেশের সরকার ও জনগণের সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়া প্রশ্ন উঠিতেছে। একই প্রশ্ন আমাদের দেশেও উঠিতেছে। রাজধানী ঢাকার আশপাশে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের দখল ও দূষণের পর ধলেশ্বরী নদীর বিপর্যকর পরিস্থিতিও আলোচনার পাদপীঠে উঠিয়া আসিয়াছে। যে ট্যানারি বর্জ্যের জন্য একসময় বুড়িগঙ্গা মরিয়া যাওয়ার অভিযোগ তোলা হইত, তাহা এখন ধলেশ্বরীর জন্যও একইভাবে সর্বনাশ ডাকিয়া আনিয়াছে। সম্প্রতি এই নদীতে বিভিন্ন প্রকারের মাছ ভাসিয়া উঠিতে দেখা গিয়াছে। বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত দেড় শতাধিক ট্যানারির সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে এবং কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার তথা সিইটিপির নির্মাণকাজ এখনো শেষ না হওয়ায় দুর্গন্ধে ইহার আশপাশে বসবাস করাই কঠিন হইয়া পড়িয়াছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের বৃহত্তম নদী পদ্মার অবস্থাও শোচনীয়। প্লাস্টিক ও নানা ধরনের কঠিন বর্জ্যের পাশাপাশি শহরের বর্জ্য এই নদীতে ফেলা হইতেছে নির্বিচারে। এমনকি বাসাবাড়ির প্রতিদিনের গৃহস্থালি ময়লা-আবর্জনাও ফেলা হইতেছে। শহরের পাঁচটি স্লুইসগেটের মাধ্যমে শহরের তরল বর্জ্য এই নদীর পানিতে মিশিতেছে। সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব অবহেলা ও স্থানীয় অধিবাসীদের অসচেতনতার কারণে পদ্মা নদীর দূষণ ক্রমেই বাড়িতেছে। সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ি বা ভ্যান কেন নদীতীরবর্তী এলাকায় নিয়মিত যাইতেছে না তাহার সুরাহা করা প্রয়োজন। শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে যেসব দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনা রহিয়াছে, সেখানকার লোকেরাও অবিবেচকের মতো বিভিন্ন ক্ষতিকর বর্জ্য নদীতে ফেলিতেছে। বর্তমানে বরিশালের নৌবন্দর এলাকায় নাব্য সংকট দূরীকরণের জন্য ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালিত হইতেছে। কিন্তু সেইখানেও বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়া যাইতেছে এবং এই জন্য ড্রেজিং কার্যক্রম পর্যন্ত ব্যাহত হইতেছে। লঞ্চ ও স্টিমারে এবং নৌবন্দর এলাকায় উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকিলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হইত না। লঞ্চগুলিতে কোনো গার্বেজ ব্যবস্থাপনা নাই। উপর্যুক্ত পরিস্থিতি বলিয়া দিতেছে নদীর দূষণের ব্যাপারে আমরা সাধারণ জনগণ কতটা অসচেতন ও বেখেয়াল। আমরা বারংবার নদীনালা ও খাল-বিলে গৃহস্থালি ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলিতে থাকিব এবং সরকার আমাদেরই ট্যাক্সের টাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনসহ নানা কারণে সেই নদনদী ও খাল-বিলের বর্জ্য অপসারণ করিতে থাকিবে—ইহা কি আমাদের নির্বুদ্ধিতা ও দ্বিচারিতা নহে? বুড়িগঙ্গার বর্জ্য অপসারণ করিবার জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় হইতে একবার ১০০ কোটি টাকা প্রদান করা হইয়াছে। অন্যান্য উত্স হইতেও একই কাজে অর্থ প্রদান করা হইয়াছে। কিন্তু তাহাতেও কি বুড়িগঙ্গা দূষণমুক্ত হইয়াছে? যদি না হইয়া থাকে, তাহা হইলে এই দায় কাহার? বিদেশে নিজ বাড়ির আঙিনায় ময়লা-আবর্জনা থাকিলে এমনকি ফুলের বাগান অগোছালো থাকিলে জরিমানা গণনা করিতে হয়।

বাংলাদেশের নদনদী ও জলাশয়গুলি রক্ষা না করা গেলে বাংলাদেশ বাঁচিবে না, বাংলাদেশের মানুষ বাঁচিবে না। তাই দেশের সকল নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করিবার উদ্যোগ লইতে হইবে। যাহারা নদীতে বর্জ্য ছড়ায় তাহাদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করিতে হইবে কঠোর ব্যবস্থা। আন্তঃদেশীয় নদীগুলির দূষণের ক্ষেত্রে নদীপাড়ে অবস্থিত অন্যান্য দেশগুলির শহরবাসীরও দায় রহিয়াছে। তাই এই সমস্যার সমাধানে আঞ্চলিক উদ্যোগও গ্রহণ করা আবশ্যক।