ধোলাইখাল-জিঞ্জিরার দৃশ্যপট বদলে গেছে

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২০, ২২:২১

করোনাকালে বিদেশ থেকে যন্ত্র ও ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের আমদানি কমে যাওয়ায় সুদিন ফিরেছে ধোলাইখাল-জিঞ্জিরায়। এখানকার দোকান ও কারখানার মালিকেরা বলছেন, আগে যে পণ্য বা যন্ত্রাংশ চীন থেকে আসত, সেগুলো এখন করোনাসহ নানা কারণে আনা সহজসাধ্য নয়। সমস্যা হচ্ছে, খরচও বেড়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়ে গেছে। এ কারণে ধোলাইখাল ও জিঞ্জিরায় কাজের চাপ বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, এই এলাকায় যা কিছু তৈরি হয়, করোনা মহামারি শুরু হওয়ার কিছুদিন পর থেকে সবকিছুরই চাহিদা বেড়েছে। শুধু লোহা বা লৌহজাত দ্রব্যই নয়, সবকিছুর জন্য লোকজন ছুটছে ধোলাইখাল ও জিঞ্জিরায়।        তবে সবচেয়ে বেশি চাহিদা বেড়েছে বিভিন্ন বড় মেশিনের পার্টস এবং ছোট মেশিনের।

জিঞ্জিরার আগানগর এলাকার লিটন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক মো. লিটন মিয়া বলেন, ‘গত চার মাসে ফ্যাক্টরি ডাবল করতে হয়েছে। নতুন আট জন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছি। সবাই মিলে রাতদিন পরিশ্রম করেও কাজ শেষ করতে পারছি না। এখন বাধ্য হয়ে অর্ডার ক্যানসেল করতে হচ্ছে।’ ধোলাইখালের জিএম মেটাল নানা ধরনের পণ্য তৈরি করার ডায়াস বানায়। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মাসুম মোল্লা বলেন, ‘লকডাউনের তিন মাস লোকসান হয়েছে। সেই লোকসান কাটিয়ে উঠতে আরো তিন মাস লেগেছে। এখন সবকিছু মিলে ভালো চলছে। এখন কাজ করে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। চাপ বেড়েছে দ্বিগুণ।’ ধোলাইখাল ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপের মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর কাদের বলেন, জুলাই থেকে আবার কাজের চাপ বেড়েছে। এখন সবার ব্যবসাও ভালো, কর্মীরাও ভালোই আছেন। বদলে গেছে ধোলাইখালের দৃশ্যপট।

পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের মোড় থেকে নারিন্দা পর্যন্ত এই ধোলাইখালের বিস্তৃতি। বর্তমানে এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে হাজার পাঁচেক খুচরা ও পাইকারি যন্ত্রাংশের দোকান রয়েছে। মোটর পার্টসের দোকান ছাড়াও এখানে রয়েছে ড্রামশিট, লেদ মেশিন, পুরোনো লোহা-লক্কড়ের দোকান। ধোলাইখালে তৈরি সামগ্রীর মধ্যে আছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মডেলের গাড়ির পার্টস, লাইনার, বিয়ারিং, ব্রেকড্রাম, ইঞ্জিন, কার্টিজ, সকেট, জগ, জাম্পার, স্প্রিং, হ্যামার, ম্যাকেল জয়েন্ট, বল জয়েন্ট, ট্রাক, লরি, অটোরিকশা, মেডিক্যাল বেড, ডায়নামো, এসি, ফ্রিজ, নিনিয়াম, প্যাড ড্রাম, ব্রেক সিলিন্ডার, বাম্পার ব্রাকেট, পিস্টন, পাম্পসহ নানা সামগ্রীর খুচরা যন্ত্রপাতি। পাশাপাশি আস্ত গাড়ি, গাড়ির ইঞ্জিন, লঞ্চের ইঞ্জিনও তৈরি হচ্ছে। এছাড়া কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, মেরিন যন্ত্রাংশ, মোল্ড অ্যান্ড ডাই, টেক্সটাইল যন্ত্রাংশ, জুট মিল যন্ত্রাংশ, চা-বাগান এবং মিলের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, নির্মাণশিল্পের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, বেকারিশিল্পের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, মেটাল ফার্নিচার, কাগজ মিলের যন্ত্রাংশ, পশুপালন শিল্পের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ এবং অটোমোবাইলের যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে।

ধোলাইখাল ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির নেতারা জানান, এখানকার উদ্যোক্তারা বিভিন্ন সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে সাবকন্ট্রাক্টের মাধ্যমে যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে এনেছেন। এখানে তৈরি যন্ত্রাংশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বেশ কিছু দেশেও রপ্তানি হচ্ছে। জানা গেছে, মালিক, কর্মচারী, কারিগর মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষ তাদের জীবিকার জন্য ধোলাইখালের ওপর নির্ভরশীল। জিঞ্জিরা ও ধোলাইখালভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার পণ্য উত্পাদিত হচ্ছে। ধোলাইখালের কারিগরেরা এখানে কাজ করতে করতে একসময় নিজেরাই দোকানের মালিক হন। এদের দক্ষতা অবিশ্বাস্য।

অন্যদিকে জিঞ্জিরায় বাবুবাজার ব্রিজের পাশেই নিউ গুলশান সিনেমা হলের পাশ থেকে শুরু করে দীর্ঘ এলাকায় চলে লোহা প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ। আগানগর পল্লী বিদ্যুত্ উপকেন্দ্রের পাশেই সোহাগ মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ। এখানে লোহা প্রক্রিয়াজাত করে ট্রাক বা বাসজাতীয় বিভিন্ন গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির শিফট ইনচার্জ মাহিদুর রহমান বলেন, এই এলাকায় খুব কম কারখানারই অফিস আছে। সাধারণত মালিক নিজেই কয়েক জন কর্মচারী নিয়ে ছোট কারাখানা খুলে কাজ করেন। করোনার আগে ব্যবসা খুব খারাপ গেছে। গত কয়েক মাসে কাজের চাপ অনেক বেড়েছে। এখন নাইট শিফটেও ফুলটাইম কাজ করতে হয়। জিঞ্জিরার লোহাপট্টি এলাকায় বেশ কিছু কারখানা রয়েছে, যেগুলোতে মোবাইলের কাভার, হেডফোন, চার্জার, ব্যাটারি তৈরি করা হয়। এসব কারখানায় সাধারণত কোনো নামী ব্র্যান্ডের নামে পণ্য তৈরি হয়। একই ধরনের পণ্য চীন থেকেও আমদানি করা হয়। চীন থেকে মাল আসছে কম, তাই ব্যবসা জমজমাট। টেলিকম যন্ত্রাংশ তৈরির প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং ম্যানেজার আল আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশে তৈরি হয় অনেক কিছু। আবার একই ধরনের পণ্যই চীন থেকেও আনা হয়। কিন্তু চার্জার ও টর্চলাইট ছাড়া অন্য কোনো পণ্য উত্পাদনকারীর নামে বিক্রি করা হয় না। সবই বিক্রি হয় কোনো নামী ব্র্যান্ডের নামে। আগে আমরা কোনো কিছু তৈরি করে বিক্রি করতে হিমশিম খেয়ে যেতাম। এখন তৈরি শেষ হওয়ার আগেই অর্ডার পাচ্ছি।’ সংশ্লিষ্টরা জানান, ফ্রিজ, টিভি, মোবাইল, ওভেন, চার্জারসহ ইলেকট্রনিক পণ্য ও পণ্যের যন্ত্রাংশের প্রায় ৮০ ভাগই আসে চীন থেকে। কিন্তু বর্তমানে শিপমেন্ট কমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চীন থেকে সবচেয়ে বেশি কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, তৈরি পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিজাত বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামালের প্রায় ৭০ শতাংশ আসত চীন থেকে। কিন্তু বর্তমানে এসব কাঁচামাল খুব সীমিত পরিমাণে আসছে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীন থেকে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়েছে, যা মোট আমদানির ২৬ শতাংশেরও বেশি। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে করোনার প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির পর থেকে চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি সীমিত হয়ে পড়ে। লকডাউনে এলসি খোলা বন্ধ হয়ে যায় চীন-ভারতসহ সব দেশের। পরে খুললেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি এখনো।