ক্রমশ অবস্থার উন্নতি হইবে নিশ্চয়ই

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২০, ২১:৩৬

ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমেই সমাজ ক্রমশ বসবাসের উপযুক্ত হইয়া উঠে। বাংলাদেশের পুলিশের মধ্যেও সেই ইতিবাচক পরিবর্তন ক্রমশ দৃশ্যমান হইতেছে। ইহা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক খবর। ইহার সবচাইতে বড় প্রমাণ জাতীয় জরুরি সেবামূলক নম্বর ৯৯৯। পুলিশের এই জরুরি সেবা সার্ভিস নম্বরে ফোন করিয়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হইতে প্রতিদিন দারুণ সকল সেবা গ্রহণ করিতেছেন অসংখ্য সাধারণ নাগরিক। খুন, ধর্ষণ, অগ্নিকাণ্ড ও বাল্যবিবাহের মতো ঘটনায় ফোন করিয়া দ্রুত সেবা গ্রহণের অসংখ্য ঘটনা আছে। বলা যায়, সাধারণ মানুষের বিপদের বন্ধু হইয়া উঠিয়াছে এই জরুরি সহায়তা সার্ভিসটি। কিন্তু ‘বাঘে ছুঁইলে আঠারো ঘা আর পুলিশে ছুঁইলে ছত্রিশ ঘা’—এই প্রবাদের ব্যাপারে মানুষ এখনো দ্বিধাবিভক্ত। থানায় গিয়া সত্যিই কি পুলিশের নিকট হইতে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা পায় সাধারণ জনগণ? পুলিশি হেফাজতে অত্যাচার, জুলুম, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অনেক ঘটনা প্রতিনিয়তই সংবাদপত্রে প্রকাশ পায়। প্রকৃতপক্ষে, ব্রিটিশরা এই উপমহাদেশে পুলিশ বাহিনী গঠন করিয়াছিল শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসাবে নহে, বরং জনগণকে ঠ্যাঙাইয়া ক্ষমতার পথ মসৃণ করিবার বৃহত্ লক্ষ্য ছিল তাহাদের। দেশভাগের পর ব্রিটিশের এই নীতি হইতে খুব বেশি সরে নাই নূতন ক্ষমতাসীনরা। যেই কারণে মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের ন্যায়সংগত আন্দোলনেও তত্কালীন পাকিস্তানি সরকার পুলিশ দিয়াই মিছিলে গুলি চালাইয়াছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পুলিশের ঔপনিবেশিক মানসিকতা পরিবর্তনের একটি বিশাল সুযোগ আনিয়া দিয়াছিল। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর অসামান্য অবদান ও আত্মত্যাগের কারণে স্বাধীন দেশে সাধারণ মানুষের মনে পুলিশি ভীতিও বহুলাংশে দূর হইয়াছিল। কিন্তু পুলিশ শব্দের অর্থ অনুযায়ী যেই ধরনের পুলিশ আমাদের পাইবার কথা, তাহা যে কোনো কারণেই হউক, আমরা পাই নাই।

তবে আশার কথা হইল, সময়ের প্রয়োজনে পুলিশের ভিতরে ক্রমশ ইতিবাচক পরিবর্তন আসিতেছে, যাহার ভার্চুয়াল প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে জাতীয় জরুরি নম্বরে। পুলিশের মধ্যে যে অভূতপূর্ব পেশাদারিত্বের ছাপ দেখা যাইতেছে, তাহার সর্বশেষ প্রমাণ মিলিয়াছে এই বাহিনীর মধ্যে একধরনের শুদ্ধি অভিযানে। গত বরিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগ জানাইয়াছে, ডোপ টেস্টে মাদক গ্রহণের প্রমাণ মিলায় পুলিশ বাহিনী হইতে এখন অবধি অভিযুক্ত ৬৮ জনের মধ্যে চূড়ান্ত বরখাস্ত করা হইয়াছে ১০ জনকে, সাময়িক বরখাস্ত করা হইয়াছে ১৮ জনকে। ইহার বাহিরেও ৪৩ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হইয়াছে। আরো ২৫ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রহিয়াছে। তাহা ছাড়া, মাদক বিক্রি, মাদক দিয়া ফাঁসানো ও উদ্ধারকৃত মাদক উদ্ধারের তুলনায় কম দেখাইয়া টাকা নেওয়ার অভিযোগ আনা হইয়াছে আরো ২৯ জনের বিরুদ্ধে। তাহাদের মধ্যে শাস্তিও হইয়াছে ছয় জনের। বলিবার অপেক্ষা রাখে না—সরিষার মধ্যে ভূত থাকিলে ভূত তাড়ানো দূরে থাকুক, উহারা ঝাড়েবংশে আরো বৃদ্ধি পায়। মাদক-সম্পর্কিত অপরাধ দমন বা নির্মূল করিবার দায়িত্ব প্রধানত পুলিশের উপরই ন্যস্ত। সুতরাং সেই পুলিশ সদস্যই যদি মাদকাসক্ত হন, মাদক ব্যবসার সহিত জড়িত হন কিংবা মাদককে হাতিয়ার করিয়া অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে কীভাবে মাদকের বিরুদ্ধে সত্যিকারে জিরো টলারেন্স দেখানো সম্ভব হইবে? অতএব পুলিশ বাহিনীতে ডোপ টেস্ট করানো অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা। আমরা আশা করিব, পেশাদারিত্বের অংশ হিসাবে এই ডোপ টেস্ট নিয়মিত করা হইবে।

পুলিশ বলিয়া যাহা খুশি তাহা করিয়া রক্ষা পাওয়া যাইবে—সেই অরাজক দিন ক্রমশ বদলাইতেছে। এমনকি ২০১৩ সালে প্রণীত ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)’ আইনে সম্প্রতি তিন পুলিশকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হইয়াছে। নিশ্চয়ই আমরাও উন্নত বিশ্বের মতো উন্নত পুলিশ পাইব একদিন।