ঢাকায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশে ধর্ষণ বন্ধের দাবিতে সংঘটিত অক্টোবরের বিক্ষোভ দ্বারা আমরা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত। যখন এটি বিশ্বব্যাপী একটি গুরুতর সমস্যা এবং কোনো রাষ্ট্রই এই সমস্যার বাইরে নয়, তখন ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়বিচার, যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে অর্থবহ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তা প্রদানের দাবিতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সোচ্চার প্রতিবাদ বিশ্বের কাছে শক্তিশালী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সংকেত প্রদান করে যে, বাংলাদেশ অবশ্যই যৌন নিপীড়কদের দায়মুক্তির অবসান ঘটাবে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধর্ষণের অপরাধ সাব্যস্ত হওয়ার হার এক শতাংশেরও নিচে। গত বছর ‘লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাবিরোধী ১৬ দিন’ শীর্ষক আন্দোলনের আওতায় একটি জাতীয় সংলাপে প্রণীত ১০ দফা কর্মপরিকল্পনা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা অবসানে আমাদের লড়াইয়ের এক অসাধারণ সূচনা নির্দেশ করে।
সম্প্রতি এই বিক্ষোভের সূত্রপাত একটি বিশেষ মর্মান্তিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হলেও এটি কোভিড-১৯ মহামারিকালে নারী ও বালিকাদের প্রতি লৈঙ্গিক সহিংসতার সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের প্রতিফলন। ২০১৯ সালে ইউএন উইমেন জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী ২৪ কোটি ৩০ লাখ নারী ও বালিকা (১৫-৪৯ বছর বয়সি) তাদের ঘনিষ্ঠজনদের দ্বারা শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ব্র্যাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে মহামারির প্রভাব বাড়ার পর নারী ও মেয়েদের প্রতি সহিংসতার নথিভুক্ত ঘটনা বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত জরিপে সারা দেশের ২০-৪০ শতাংশ নারী ও শিশু উত্তরদাতা জানান যে, তারা প্রথমবারের মতো শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কোভিড-১৯-এর আগেও বাংলাদেশে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় দায়বদ্ধতার অভাব ছিল। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ পরিচালিত বহু দেশীয় এক জরিপে বাংলাদেশের পুরুষদের মধ্যে ধর্ষণ করার কথা স্বীকার করেছে—এমন ৮৮ শতাংশ গ্রামীণ ও ৯৫ শতাংশ শহুরে উত্তরদাতা বলেছে যে, তাদের কোনো আইনি ফল ভোগ করতে হয়নি।
কোভিড-১৯ মহামারিকালে নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই ঘটছে এমন নয়। এটা বৈশ্বিক প্রবণতারই প্রতিফলন। ইউএন উইমেনের প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, মহামারিকালে বাড়িতে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, আর্থিক চাপ ও উদ্বেগ বৃদ্ধির কারণে নারী ও মেয়েদের প্রতি যৌন ও শারীরিক সহিংসতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
ধর্ষণের অভিশাপ নির্মূল করতে সমাজের সর্বস্তরের পুরুষ ও নারী, আন্দোলনকারী এবং অন্যান্য সমমনা নাগরিকের সার্বিক প্রচেষ্টা আবশ্যক। জাতিসংঘ এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আয়োজিত উক্ত সংলাপে ২৫০ জনেরও বেশি সরকারি ও সুশীল সমাজ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী ও ভুক্তভোগীদের অধিকার সমর্থকগণ যৌন সহিংসতার মূল কারণ এবং এর অবসানকল্পে সম্ভাব্য পদক্ষেপবিষয়ক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। জাতীয় এই সংলাপেই ১০ দফা কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।
এই ১০ দফা একটি অর্থবহ ও চিন্তাশীল কর্মপরিকল্পনা। যে সব বৈষম্যমূলক আইন ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে ঘটনার অভিযোগ আনতে নিরুত্সাহিত করে সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ এবং চারিত্রিক সনদ দাখিলের নিয়ম সংশোধনের দাবি উত্থাপনসহ সহিংসতা থেকে বেঁচে আসা ব্যক্তিদের কার্যক্রম পরিকল্পনা প্রণয়নের কেন্দ্রে রাখার সুপারিশ করা হয়েছে এই ১০ দফায়। আমরা এর পূর্ণ বাস্তবায়নে অব্যাহত সমর্থন দিচ্ছি এবং স্বাস্থ্য, আইন, জীবিকা ও মনোঃ সামাজিক সহায়তাসহ যৌন-সহিংসতা প্রতিরোধে মানবাধিকার ও ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহু খাতভিত্তিক সমন্বয় পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর পুনরায় জোর দিচ্ছি।
১০ দফা পদক্ষেপে বৈষম্যমূলক আইনগুলোর সংশোধন এবং বিদ্যমান যৌন সহিংসতা বিষয়ক আইনকানুন ও নীতিমালা উন্নয়নের আবশ্যকতার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার আইনজীবীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান দণ্ডবিধিতে যৌন অপরাধের সংজ্ঞাগুলো সেকেলে এবং এর পরিসর অত্যন্ত সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, পুরুষ ও ছেলেদের প্রতি লৈঙ্গিক সহিংসতা বিষয়ে আলোচনার কোনো আইনি পরিকাঠামো নেই, কেননা ধর্ষণের বর্তমান আইনি সংজ্ঞা অনুযায়ী পুরুষদের ধর্ষণ করা যায় না। বিষয়টিকে আমরা বিরাট আইনি ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা করছি এবং এ বিষয়ে আরো বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করছি।
সাক্ষী সুরক্ষাব্যবস্থার অভাব এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। দ্রুত তদন্ত, বিচার ও উপযুক্ত শাস্তিসহ সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আমরা বাংলাদেশ সরকারকে উত্সাহিত করছি।
প্রকৃত সংস্কার আনতে এবং ধর্ষণ নির্মূল করতে পুরুষ ও ছেলেদের অবশ্যই এ বিষয়ে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের অবশ্যই পুরুষ ও নারী উভয়কেই সম্পৃক্ত করতে হবে। বহু যুগ ধরেই ধর্ষণকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। আমাদের অবশ্যই যৌন নির্যাতনকে লৈঙ্গিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা শুরু করতে হবে, যেখান থেকে জেন্ডার বিষয়ক সার্বিক গত্ বাঁধা ধারণার মধ্যে ধর্ষণকে অসমতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। লৈঙ্গিক সহিংসতার প্রধান কারণ জেন্ডার বিষয়ক গত্ বাঁধা ধারণা ও বৈষম্য। আবার সহিংসতা নিজেই বৈষম্যমূলক মনোভাবকে আরো বাড়িয়ে তোলে, ফলে তৈরি হয় এক দুষ্টচক্র। ধর্ষণ বন্ধের পদক্ষেপ অবশ্যই বাড়ি থেকে শুরু করতে হবে। পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের দেখাবেন ও শেখাবেন যে, ছেলে ও মেয়ে উভয়ই সমান ভালোবাসা ও সম্মানের পাত্র। এই পদক্ষেপগুলোই পুরুষ ও নারী—সবার প্রতি বৃহত্তর সম্মান তৈরি করে। সহিংসতার শিকার ব্যক্তিকে দোষারোপ করা এবং সহিংসতাকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা—উভয় প্রবণতাকেই সামাজিক প্রথা এবং নারী ও পুরুষের চিন্তাধারা ও আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে মোকাবিলা করা যেতে পারে। যৌন সহিংসতার জন্য ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা যাবে না।
পরিশেষে, ২০২৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের অবস্থান থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিধায় আমরা বিশ্বাস করি, ধর্ষণ ও অন্যান্য লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা কীভাবে নারীদের পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে এবং সেই সঙ্গে সমাজে তাদের সমান অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে—এ নিয়ে বাংলাদেশিরা ভাববে। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা ভুক্তভোগীদের চিকিত্সাব্যয় বাড়ায় এবং তাদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে। ফলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশও সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাধাগ্রস্ত হয়।
লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এমন একটি জরুরী বিষয় যা নিয়ে অনতিবিলম্বে আমাদের সবাইকে দেশীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা মোকাবেলায় জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ এবং দেশের সকল পর্যায়ে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।
লেখকবৃন্দ :আর্ল রবার্ট মিলার-বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত; রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার; হ্যারি ভেরওয়েইজ, বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডস কিংডমের রাষ্ট্রদূত; জিন-মেরিন শুহ, বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত; আলেকজান্দ্রা বার্গ ভন লিন্ডে, বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত; স্পেন রিকটার-সভেন্ডসেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত; উইনি এস্ট্রুপ পিটারসেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনিশ রাষ্ট্রদূত; বেনওয়া প্রিফন্টেইন-বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনার; নাথালি চুয়ার্ড, বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত; সিমন ফ্লোরেস, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার এবং রেনসে টেরিংক, বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ প্রতিনিধি দলের প্রধান
[‘লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাবিরোধী ১৬ দিন’ শীর্ষক আন্দোলন-২০২০ উপলক্ষ্যে যৌথ উপসম্পাদকীয়]
