ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ)-এর সহিত ব্রিটেনের বিচ্ছেদ তথা ব্রেক্সিট কেমন করিয়া নিষ্পন্ন হইবে তাহা লইয়া মঙ্গলবার আইনসভার নিম্নকক্ষ হাউস অফ কমন্সে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে আনীত প্রস্তাবটি বিব্রতকর ব্যবধানে পরাজিত হইয়াছে। মে-এর উত্থাপিত প্রস্তাবটির বিপক্ষে ৪৩২ এবং পক্ষে ২০২টি ভোট পড়িয়াছে। ১৯১৮ সালের পরে ব্রিটেনে আর কখনো প্রধানমন্ত্রী উত্থাপিত কোনো প্রস্তাব পার্লামেন্টে এহেন ব্যবধানে পরাজিত হয় নাই। উল্লেখ্য, মে-এর নিজ দল কনজারভেটিভ পার্টির ৩১৭ জনের মধ্যে ১১৮ জন পার্লামেন্ট সদস্য তাঁহার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়াছেন। এই সদস্যরা মূলত মে-এর প্রস্তাবটিকে কোমল-ব্রেক্সিট হিসাবে গণ্য করিতেছেন। তাঁহাদের মতে, এই প্রস্তাব পাস করিলে ব্রেক্সিট হইয়া যাইবার পরেও কতিপয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইইউ-এর প্রভাব থাকিয়া যাইবে। ব্রেক্সিটের জন্য ব্রিটেন কর্তৃক ইইউকে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক, ব্রেক্সিটের পরে ইইউতে ব্রিটিশ নাগরিক ও ব্রিটেনে বাসরত ইইউ-দেশগুলির নাগরিকদের অবস্থা এবং ব্রিটেনের অঙ্গরাজ্য উত্তর আয়ারল্যান্ডের সহিত স্বাধীন আয়ারল্যান্ডের সীমান্ত-সম্পর্ক লইয়াই প্রধান মতদ্বৈধতাগুলি সৃষ্টি হইয়াছে।
পার্লামেন্টে মে-এর প্রস্তাবটি পরাজিত হইবার পরে তাঁহার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপিত হইয়াছে। নিয়মমাফিক বুধবার পার্লামেন্টে মে-এর সরকারকে পার্লামেন্ট সদস্যদের আস্থা ভোটে জয়লাভ করিতে হইবে। এইক্ষেত্রে অবশ্য মে-এর তেমন কোনো বেগ পাইবার কথা নহে। যেই সকল এমপি মঙ্গলবার বিরোধিতা করিয়াছেন তাঁহারা কোনোভাবেই মে-এর বিরুদ্ধে ভোট প্রদান করিয়া নিজেদের বিরোধী দলের আসনে দেখিতে চাহিবেন না। আস্থা-ভোটে জিতিবার স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই তাঁহাকে নূতন একটি ব্রেক্সিট প্রস্তাব পার্লামেন্টে লইয়া আসিতে হইবে। তবে আস্থা ভোটে জিতিলেও, মঙ্গলবারের ভোটের মধ্য দিয়া থেরেসা মে যে দেশের ভিতরে ও ইইউ-এর সহিত দেন-দরবারের ক্ষেত্রে সাংঘাতিকভাবে দুর্বল হইয়াছেন তাহা বলাই বাহুল্য। নূতন প্রস্তাবটিও পার্লামেন্টে পরাজিত হইলে ব্রিটেনে অদূর ভবিষ্যতে একটি সাধারণ নির্বাচন আসিতে বাধ্য। আর কোনোক্রমে পার্লামেন্টে নূতন প্রস্তাবটি পাস হইয়া গেলেও, নিজ-দলের মধ্যেই গুরুতর সমর্থনহীনতায় ভূগিতে থাকা মে সম্ভবত ব্রেক্সিট লইয়া নূতন একটি গণভোটের পথেই হাঁটিবেন। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের গণভোটে সামান্য ভোটে ব্রেক্সিট প্রস্তাব পাস হইলেও, সাম্প্রতিক জরিপগুলিতে ব্রেক্সিটের বিপক্ষে সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পরিলক্ষিত হইতেছে।
অভিবাসী বিশেষত ইইউ-এর অপেক্ষাকৃত কম-সচ্ছল দেশগুলি, উদাহরণস্বরূপ পোল্যান্ড, রুমানিয়া, হাঙ্গেরি, হইতে আগত অভিবাসীদের সাধারণ ব্রিটিশদের কর্মহানির প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করিয়া ব্রেক্সিটপন্থিরা ২০১৬ সালে বিজয়ী হইয়াছে। ইহার সঙ্গে মিশিয়াছিল এশিয়া-আফ্রিকার অসচ্ছল দেশগুলি হইতে আগত অভিবাসীদের প্রতি সাংস্কৃতিক ও উগ্র জাতীয়তাবাদী বিদ্বেষ। উগ্র-ব্রেক্সিটপন্থিরা এই মানসিকতাকে জিয়াইয়া রাখিয়াই ইইউ-এর সহিত কোনো বোঝাপড়া ব্যতিরেকেই ব্রেক্সিট সারিয়া ফেলিতে চাহিতেছে। অন্যদিকে, যতই দিন যাইতেছে ইইউ ছাড়িবার বিপক্ষের জনমত ততই শক্তিশালী হইতেছে। এমতাবস্থায় ব্রিটেনের রাজনৈতিক এলিটবৃন্দ শেষাবধি কোন পথে হাঁটিবেন? ইইউ কিংবা ইইউভুক্ত দেশগুলি কিন্তু ইইউ-এর সহিত বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে ব্রিটেন কোনো ছাড় পাইবে না বলিয়া জানাইয়া রাখিয়াছে!
