শান্তির জনপদ পার্বত্য চট্টগ্রামকে ফের অশান্ত করার পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই জনপদে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে আঞ্চলিক দল নামধারী কিছু সশস্ত্র গ্রুপ। যাদের কথার অবাধ্য হওয়ার কারণে ২০১৮ সাল থেকে গত তিন বছরে ৩ শতাধিক মানুষ নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েক জন সিনিয়র নেতাও ছিলেন যাদেরকে আঞ্চলিক দল ছেড়ে আওয়ামী লীগ করার অপরাধে প্রাণ দিতে হয়েছে। ঐ এলাকায় বছরে চাঁদাবাজি হয় ৪০০ কোটি টাকার ওপরে। এছাড়া সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে নীরবে চলছে নারী নির্যাতন। নারীদের অস্ত্রের মুখে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করা হয়।
বান্দরবান জেলায় প্রায় ২৫ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্ত রয়েছে। সীমান্তের ঠিক ওপারে ছোট ছোট ক্যাম্প তৈরি করে চলছে অস্ত্র প্রশিক্ষণ। ইতিমধ্যে এ ধরনের ১২ থেকে ১৫টি ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী একটি দেশ থেকে নিয়মিত অস্ত্রের চালান আসছে। বাংলাদেশ সরকারের মনোযোগ রোহিঙ্গা ইস্যু থেকে ভিন্ন খাতে পরিচালিত করার জন্যই সীমান্তের ওপারে গহীন জঙ্গলে এসব ক্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কথিত ‘জুম্মল্যান্ড’ সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির নেপথ্যে রয়েছেন তিন প্রভাবশালী ব্যক্তি। এদের মধ্যে দুই জন দুইটি আঞ্চলিক দলের নেতৃত্বে রয়েছেন। তৃতীয় জন হলেন রাঙ্গামাটি জেলার এক চাকমা নেতা। মূলত এই তিন ব্যক্তির খেয়ালখুশিমতো চলছে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান। তারা তিন জন প্রকাশ্যে পার্বত্য শান্তিচুক্তির বিরোধিতা না করলেও পাহাড় অশান্ত করার নেপথ্যের কুশীলব এরাই।
উল্লেখ্য, কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ ২১ বছরের সংঘাত এবং রক্তক্ষরণের অবসান ঘটে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সব মানুষ ঐতিহাসিক এই শান্তিচুক্তিকে স্বাগত জানান। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত এই চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা।
জানা গেছে, চুক্তির পর প্রথমে কিছুদিন নীরব ছিল জেএসএস। তবে পরবর্তী সময়ে তাদের এক নেতা ঘোষণা দিয়েই পুনরায় পাহাড় অশান্ত করার খেলায় মেতে ওঠেন। চুক্তির পর গত ২৩ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠী আর্থসামাজিকভাবে অনেকটাই এগিয়ে গেছে; কিন্তু আঞ্চলিক দলগুলোর নেতারা এসব উন্নয়ন দেখেও দেখেন না। তারা পার্বত্যবাসীসহ সমগ্র বিশ্বের সামনে এমন একটি ধারণা দিতে চান যে, বাংলাদেশ সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়।
এসব নেতা পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে শুধু মিথ্যাচারই করছেন না, সরকার যাতে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করতে না পারে সেজন্য পদে পদে বাধা সৃষ্টি করছেন। একসময় জনসংহতি সমিতি নামে একটি আঞ্চলিক সংগঠন ছিল। সেটি ভেঙে একে একে আরো তিনটি আঞ্চলিক সংগঠন জন্মলাভ করেছে। এরা হচ্ছে—জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ (প্রসীত খীসা) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। এই চারটি সংগঠনের পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। অস্ত্রধারীদের হাতে পার্বত্যবাসী জিম্মি হয়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ এদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ। দরিদ্র পাহাড়িরা একটি ডিম বিক্রি করলেও এদেরকে চাঁদা দিতে হয়। প্রতি বছর তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান থেকে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো প্রায় ৪০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি করে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে যে প্রত্যাশা জন্ম নিয়েছিল তা বাস্তবায়নে পদে পদে বাদ সাধছে আঞ্চলিক দলগুলো। এছাড়া আরো এক হাই প্রোফাইল ব্যক্তি রয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলায়, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে যার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ঐ ব্যক্তির বাবা ছিলেন একজন কুখ্যাত রাজাকার, যিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। জানা গেছে, ঐ নেতা উচ্চশিক্ষার নামে প্রতি বছর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তরুণদের বিদেশে পাঠান। তবে এর পেছনে নেতার সুদূরপ্রসারি উদ্দেশ্য রয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে একটি আঞ্চলিক সংগঠনের নেতার ভূমিকাও রহস্যজনক। জানা গেছে, তিনি বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন। তার গাড়িতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাও থাকে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তিনি বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা একুশে ফেব্রুয়ারির কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেন না। তার বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রও নেই। তিনি প্রতি বছর ঢাকার হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে স্পর্শকাতর বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যের মূল ইস্যু পার্বত্য শান্তিচুক্তি হলেও তিনি মূলত সরকার ও সেনাবাহিনীবিরোধী বক্তব্য দিয়ে থাকেন; যা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আঞ্চলিক দলগুলো প্রায়শ অভিযোগ করে, দীর্ঘ দুই দশকেও শান্তিচুক্তির মৌলিক অনেক বিষয় বাস্তবায়িত হয়নি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, চুক্তির বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয়েছে। এ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়াও তিন পার্বত্য জেলায় হস্তান্তরযোগ্য ৩৩টি বিষয়/বিভাগের মধ্যে এ পর্যন্ত রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে ২৮টি বিষয়/দপ্তর হস্তান্তর করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চুক্তির কিছু কিছু ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে অবশিষ্ট চুক্তি বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। এছাড়া আদালতে শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা চ্যালেঞ্জ করে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব বিষয়সহ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পথে যে অন্তরায়গুলো রয়েছে সেগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলেই তারা মনে করেন। তবে এসব অন্তরায় দূর করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
এদিকে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না করার কল্পিত অভিযোগ উপস্থাপন করে উপজাতি বিভিন্ন সংগঠন দেশে-বিদেশে নানা ধরনের নেতিবাচক কর্মসূচি পালন করে আসছে। এরা চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও আঞ্চলিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে কথা বলে না। উলটো তারা পাহাড়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানানো শুরু করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কথিত ‘জুম্মল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছে। অলীক স্বপ্ন দেখিয়ে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি ও সাধারণ উপজাতিদের কাছ থেকে আদায় করছে বিপুল অঙ্কের চাঁদা। তা দিয়ে তারা তাদের সশস্ত্র গ্রুপকে শক্তিশালী করছে। গোপনে বিদেশ থেকে কেনা হচ্ছে ভারী, দামি ও অত্যাধুনিক অস্ত্র। সামরিক আদলে কাঠামো তৈরি করে নিজেদের সংগঠিত করছে।
সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে যে, শান্তিচুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এবং এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সমতলের জেলাগুলোর মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা গড়ে উঠেছে। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করে ইতিমধ্যে পাহাড়ের সব উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিলোমিটার রাস্তা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে নির্মাণ করেছে প্রায় ১ হাজার ৫৩৫ কিলোমিটার রাস্তা। নির্মিত হয়েছে অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। এছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ সড়ক তৈরি, অরক্ষিত সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধান, অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার, ঘরে ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছে দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার হার ২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪৪.৬২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
