চট্টগ্রাম-হাতিয়া নৌসার্ভিসে জরাজীর্ণ জাহাজে (স্টিমার) যাত্রীদের ভোগান্তি, ঘাট এলাকা ভরাট ও চ্যানেলে পলি জমে নাব্য হ্রাস এবং যাত্রী কমে যাওয়ায়সহ নানা সমস্যা বিরাজ করছে। ফলে এক সময়ের লাভজনক সার্ভিসটি যাত্রীর অভাবে এখন লোকসান দিচ্ছে। সার্ভিসে নিয়োজিত তিনটি জাহাজের মধ্যে একটি অনেক আগেই অকেজো হয়ে পড়েছে। আর জরাজীর্ণ দুটি জাহাজে জোড়াতালি দিয়ে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, লোকসান হলেও উপকূলীয় ও দ্বীপবাসীর যাতায়াতের জন্য সার্ভিস চালু রেখেছে সরকার। শিগিগরই নতুন দুটি জাহাজ বহরে যুক্ত হবে। এতে যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি পাবে।
জানা গেছে, অনেক আগেই চট্টগ্রাম-বরিশাল সার্ভিস বন্ধ হয়ে গেছে। দেড় বছর যাবত সন্দ্বীপ চ্যানেলও বন্ধ রয়েছে। যাত্রী পরিবহন নিয়ে চ্যানেলের এই দুরবস্থা দীর্ঘদিন যাবত বিরাজ করছে। ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ না নেওয়ায় ঘাটগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিকল্প সি-ট্রাক ও নৌকা দিয়ে জাহাজে যাত্রী উঠানামা করা হচ্ছে। ঘাট থেকে অনেক দূরে জাহাজ নোঙর করতে হয়। স্টিমার সার্ভিস সংকুচিত হওয়ায় উপকূলীয় এলাকার যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এই সার্ভিসে কম খরচে গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো যায়। এছাড়া মালামাল পরিবহনেও সুবিধা রয়েছে। ভোগান্তির কারণে সুবিধাবঞ্চিত উপকূলবাসী এখন বিকল্প পথে যাত্রা করছে।
বরিশাল, হাতিয়া, ভোলা ও সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় এলাকায় অনেক মানুষ চট্টগ্রাম শহরে বসবাস করেন। তাদের যাতায়াতের সহজ মাধ্যম হলো স্টিমার সার্ভিস। বহরে জাহাজ স্বল্পতা ও যাত্রীসংকটে প্রায় সাত বছর আগে বরিশাল পর্যন্ত সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। এরপর চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপ হয়ে হাতিয়া পর্যন্ত স্টিমার সার্ভিস চালু রাখা হয়। ঘাট ভরাট ও চ্যানেল পরিবর্তনের কারণে দেড় বছর আগে সন্দ্বীপ সার্ভিসও বন্ধ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বহরে যুক্ত থাকা জাহাজগুলো প্রায় ৬৫ বছরের পুরোনো। প্রায় সময় যান্ত্রিক ত্রুটি লেগে থাকে। মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেলে যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ফলে ভোগান্তির কারণে অনেক যাত্রী বিকল্প পথে যাত্রা করছে। এতে আস্তে আস্তে বিআইডব্লিউটিসির স্টিমার সার্ভিস লোকসানে পড়তে থাকে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে হাতিয়া পর্যন্ত সপ্তাহে দুই দিন স্টিমার সার্ভিস চালু রয়েছে। আগে সপ্তাহে চার দিন সার্ভিস চালু ছিল। কিন্তু স্টিমারসংকটে এখন সপ্তাহে দুই দিনের বেশি সার্ভিস চালানো যাচ্ছে না। এমভি আবদুল মতিন ও এমভি মনিরুল হক নামে দুটি জাহাজ সার্ভিসে চালু রয়েছে। এসব জাহাজের প্রতিটির যাত্রী ধারণক্ষমতা ৩৭০ জন করে। কিন্তু অর্ধেক যাত্রীও পাওয়া যায় না। এক সময় স্টিমার সার্ভিসে প্রচুর মালামাল পরিবহন হতো। এখন জাহাজ ঘাটে ভিড়তে না পারায় এক যাত্রায় দুই-তিন টনের বেশি পণ্য পরিবহন হয় না।
বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা জানান, পলি জমে নৌপথের চ্যানেলগুলোর পরিবর্তন ঘটেছে। ঘাটগুলোতে জাহাজ ভিড়তে পারছে না। পলি জমে অনেক চ্যানেল বিলুপ্ত হয়ে গেছে। চ্যানেল চালু রাখতে হলে ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন। কিন্তু ড্রেজিং নিয়ে কোনো প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে না। চ্যানেলের বিভিন্ন স্থানে জেলেরা জাল ফেলে রাখায় যাত্রী ও পণ্যবাহী জাহাজের গতি পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটছে। চট্টগ্রাম থেকে হাতিয়া পর্যন্ত চ্যানেলের দূরত্ব প্রায় ৬০ নটিক্যাল মাইল। চ্যানেল ও জাহাজের ত্রুটির কারণে একবার যেতে ৯/১০ ঘণ্টা লেগে যায়। চ্যানেল পরিবর্তনের ফলে অনেক দূর দিয়ে ঘুরে যেতে হয়।
বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা গতিশীল করার জন্য নতুন আরো দুটি জাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। আগামী জানুয়ারিতে জাহাজ দুটি বহরে যুক্ত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। মাঝখানে করোনার কারণে জাহাজ দুটির নির্মাণকাজ কয়েক মাস বন্ধ ছিল। একটি চট্টগ্রামে ও আরেকটি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বহরে অন্য জাহাজ বারআউলিয়া অকেজো অবস্থায় রয়েছে। এটি এখন মেরামত করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসি চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক গোপাল চন্দ্র মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, ‘বহরে থাকা জাহাজগুলো প্রায় ৬৫ বছরের পুরোনো। জোড়াতালি দিয়ে সার্ভিস চালু রাখা হয়েছে। নতুন দুটি জাহাজ আগামী জানুয়ারি মাসে বহরে যুক্ত হবে। তখন চট্টগ্রাম থেকে স্টিমার সার্ভিস বরিশাল পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। লোকসান হলেও দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকার জনগণের সুবিধার্থে সরকার সার্ভিস চালু রেখেছে।’
