নিন্দার কাঁটার আঘাত ম্যারাডোনার গায়ে সব সময় ছিল। তার পরও তার ফুটবল কীর্তি দুনিয়া জুড়ে তাকে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে রেখেছে। গত বুধবার ম্যারাডোনা মারা গেছেন। তারপর থেকেই তিনি সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নিশ্চই ভালো লোক ছিলেন। তা না হলে তাকে নিয়ে এত উন্মাদনাই বা কেন হবে? ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফুটবল কাভার করতে গিয়ে মনে মনে স্বপ্নের বীজ বুনেছিলাম—ফুটবলের কালো মানিক পেলেকে ধরতে হবে। অনেক দিন পেলের পথ চেয়ে সাধনা করেছিলাম। কিন্তু মাঝপথে গিয়ে পেলেকে বাদ দিয়ে ম্যারাডোনার সন্ধানে নেমেছিলাম। ’৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ জয়ী ম্যারাডোনা ব্রাজিলে আসবেন কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা থাকলেও অনেক খোঁজাখুঁজির পর সন্ধান পাওয়া গেল, তিনি ব্রাজিলেই আছেন। এই শহর থেকে ঐ শহর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ভেনেজুয়েলার একটি টিভিতে টকশো করেন। বিশ্বকাপের ম্যাচ শেষ হলে তিনি টিভি স্টেশনে গিয়ে টকশো করেন। কোথায় যান, কীভাবে যান, তাকে খুঁজে বের করা কতটা কঠিন ছিল তা এখনো মনে উঠলে গা শিউরে ওঠে। রীতিমতো দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার অবস্থা।
সব মাড়িয়ে যখন টিভি স্টেশনে পৌঁছালাম, রিওডি জেনিরোর শহর তখন গভীর ঘুমে। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে জার্মানি শিরোপা উত্সবে মেতে উঠেছে। এরই মধ্যে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নানা ঝক্কিঝামেলা পেরিয়ে সন্ধান পাওয়া গেল ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো আরমোন্দো ম্যারাডোনার। এই পথেই তিনি আসবেন। সেই পথেই বসে থাকলাম। তিনি এলেন, আমারই পাশে এক ব্রাজিলিয়ান নারীকে জড়িয়ে চুমু খেলেন। তারপরই আমার দিকে ডান হাত বাড়ালেন। আমি তখনো স্বপ্নের মধ্যে। বিশ্বাস করতে পারছি না, আমার সামনে ম্যারাডোনা দাঁড়িয়ে। তা-ও আবার তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমি সোফায় বসে তাকিয়ে থাকলাম। ঘোর কাটার আগেই উঠে দাঁড়াতেই হাসি দিলেন ম্যারাডোনা। আমি হাত মেলালাম। তিনিও বিদায় নিয়ে টোকশোতে বসে পড়লেন আর মেকআপ নিচ্ছিলেন। তখন বুঝলাম, আমার পাশের সেই নারী ম্যারাডোনার মেকআপ করেন। আমিও অপেক্ষায়। তিনি বের হলেন দেড় দুই-ঘণ্টা পর। এর মধ্যে অনেক কিছুই ঘটে গেল। বেরিয়ে যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে কথা হয়। দেশের নাম বলতে আরো দুই কথা হলো। বাংলাদেশে আসার কথাটিও বলা হয়ে গেল। ম্যারাডোনা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা বললেন। ইত্তেফাকের দেওয়া উপহার গ্রহণ করলেন। ভিড় ঠেলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ম্যারাডোনাকে অন্য এক মানুষ দেখলাম। ফুটবল দুনিয়া জয় করা এক মানুষ, যার সঙ্গে ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও কথা বলতে চান, পাশে দাঁড়াতে চান, সেই ম্যারাডোনা টিভি স্টেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ক্যামেরাম্যান, দারোয়ান, চা সরবরাহকারী যে যেখানে ছিলেন, সবাইকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। সবার সঙ্গে আলিঙ্গন করেছেন। একাধিক নিরাপত্তাকর্মীকে আবেগে কাঁদতে দেখেছি। সেদিনই মনে হয়েছে, না দেখলে বোঝা যেত না ম্যারাডোনা কতটা ভালো মানুষ। এখন মনে হচ্ছে বড় ভালো মানুষ ছিলেন তিনি।
