দেশের বরেণ্য এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের। এদেশের সাংস্কৃতিক জগতের এক মহীরূহের বিদায়। এদেশের অগণিত তরুণ শিল্পীর জন্য পাঠ্য হয়ে থাকবে তার জীবনচরিত। আলী যাকের সর্বশেষ ইত্তেফাকের ‘ভিন্ন চোখে’ পাতায় নিজের যুদ্ধদিনের কথাও লিখেছিলেন। তার এই প্রয়াণ শ্রদ্ধায় বিচ্ছিন্ন আলাপে বরেণ্য এই মানুষটির কিছু অমূল্য স্মৃতি ও কথা তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য—
জয় বাংলা
শিয়ালদহে হঠাত্ পাশের এক ভদ্রলোক প্রশ্ন করেন, আপনারা কী জয় বাংলা থেকে আসছেন? সম্মতিসূচক মাথা নাড়ি। অনেকে বলে, আপনারা বাংলার জন্য যা করলেন আমরা তা কখনো পারবো না। একবার আমি একজনকে প্রশ্ন করেছিলাম, আচ্ছা, আমাদের দেশটার নাম তো বাংলাদেশ। আপনারা জয় বাংলা বলেন কেন? জবাব এসেছিল, আপনারা জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য যে লড়ছেন তাকে কেবল বাংলাদেশ বললে মনে হয় না যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হচ্ছে আপনাদের। জয় বাংলা বললে বুকটা ভরে যায়।
স্টপ জেনোসাইড
তখনো জহির রায়হানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। হঠাত্ একদি আলমগীর কবির ভাই বেতারের স্টুডিওতে কাজ শেষে বললেন, চল, টালিগঞ্জে যাই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, টালিগঞ্জ কেন? উনি বললেন, গেলেই বুঝতে পারবে। টালিগঞ্জে পৌঁছেই কবির ভাই আমাকে ডাবিং স্টুডিওতে নিয়ে গেলেন। সেখানেই পরিচয় হলো জহির রায়হানের সঙ্গে। ছোটখাটো মানুষটি খুব কম কথা বলতেন। আর যখনই বলতেন খুব তীক্ষ দৃষ্টিতে শ্রোতার মুখের ভাষা অবলোকন করতেন। তার সদ্য সম্পাদিত স্টপ জেনোসাইড-এর ফুটেজ চালিয়ে দেওয়া হলো। কোনো শব্দ নেই। কোনো সংগীত নেই। কেবলই ছবি। অথচ কী অসাধারণ। ছবিটির মূল কণ্ঠস্বর ছিল কবির ভাইয়ের। আর ছোট দুটি অংশ ছিল। তার একটি ছিল আমার।
একি অপরূপ রূপে...
৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের পর সারারাত ধরে ফল ঘোষণা করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানে একটির পর একটি আসনে যখন আওয়ামীলীগ জয় লাভ করতে থাকে তখন আমরা, তরুণরা উত্তেজনায় চিত্কার করে উঠেছিলাম, যেন দেশ স্বাধীন হয়েই গেছে। সেই রাত শেষে ভোরের আলো যখন ফুটল তখন আমরা সবাই রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের রাত কেটেছিল এক বড় ভাইয়ের বাসায় ধানমন্ডিতে। ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়ক দিয়ে মিরপুর সড়ক দিয়ে হাঁটছি, আর সমস্বরে গান ধরেছি ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী।’ কোথা থেকে যেন একটা বাতাস এসে আমাদের গানের বাণীগুলো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের অভিষ্ঠ লক্ষ্যের দিকে।
বুদ্ধির মুক্তি
আমি এখনো মনে করি আমাদের বুদ্ধির মুক্তি তখন [৬৯ পূর্ববর্তীকাল] তো ঘটেইনি, এমনকি আজও তা সুদূর পরাহত। বস্তুতপক্ষে বুদ্ধির মুক্তি হয়নি বলেই আমরা আমাদের বিবেকের অনুশাসনকেও মেনে চলতে শিখিনি। সে কারণেই নানাবিধ সামাজিক অনাচার, ব্যাভিচার যেমন বেড়ে চলেছে তেমনি আমাদের বুদ্ধির আয়তনও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
