‘যদি পুনর্জন্ম হয়, তাহলে মানুষ আলী যাকেরের বন্ধু হতে চাইব’

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২০, ২২:৩২

 

২০১১ সালে বাবা দিবসকে সামনে রেখে ইত্তেফাক মুখোমুখি হয়েছিল আলী যাকের, ইরেশ যাকের ও  শ্রেয়া সর্বজয়ার। তা ছাপা হয়েছিল সে বছরের বাবা দিবসে। বাবাকে নিয়ে ছেলেমেয়ের উপলব্ধি উঠে এসেছে এ সাক্ষাত্কারে। এই তিন জনের সঙ্গে এক আড্ডায় শুধু একজন আলী যাকেরের অবয়বই ফুটে ওঠেনি, বেরিয়ে এসেছে আধুনিক ও শাশ্বত এক বাবার প্রতিকৃতি। পাঠকরা আলী যাকেরকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পাবেন এখানে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন—আসিফুর রহমান সাগর।

(প্রয়াত আলী যাকেরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখাটি পুনরায় ছাপা হলো)

ইত্তেফাক :শিশু বয়স থেকে মা-ই যেন অস্তিত্ব জুড়ে থাকে। বাবাকে যেন অনেকটা দূরবর্তী দ্বীপের মতো মনে হয়। আপনারা বাবাকে কীভাবে পেয়েছেন?

শ্রেয়া :বাবা হচ্ছে বাবা। বড় হতে হতে বাবাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, সমাজে তার প্রভাব ও গতিবিধি দেখে বড় হয়েছি। মানুষের কাছে বাবার সম্মান দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। কিন্তু এর জন্য কখনো তাকে দূরের মানুষ বলে মনে হয়নি। আর একটি জিনিস হয়েছে বাবা এবং মা সারা যাকের—এ দুজনকে কখনোই আলাদা করে বুঝতে পারিনি। দুজনকে এক প্রাণ হিসেবেই পেয়েছি। অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, মূল্যবোধের শিক্ষা এসব তো আমরা মা-বাবা দুজনের কাছ থেকে পেয়েছি।

ইরেশ :আমি যখন বড় হয়ে উঠছি তখন আমার নানা কাজের ভুলগুলো দেখলে বাবা খুব কষ্ট পায়। একটা ফ্রাস্ট্রেশনে ভুগতে থাকে। হয়তো এই বয়সে বাবাও সেই ভুলগুলো করেছে। কিন্তু আমি যখন সেই কাজগুলো করি তখন বাবা খুব বিরক্তও হয়। তাছাড়া বাবা খুবই বন্ধুসুলভ। আমাদের কাছে বাবা তো মানুষ। টিভি বা মঞ্চের কোনো চরিত্র নয়। আমরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা আমাদের সঙ্গে সহজভাবে মিশেছে। তাকে দূরের মানুষ মনে হয়নি কখনোই। যে কোনো সমস্যায় বাবা পাশে আছে, এ বোধ ছড়িয়ে দিয়েছেন আমাদের অস্তিত্বে। তাছাড়া পরিবার হিসাবে আমরা কখনোই টিপিক্যাল পরিবার ছিলাম না। অনেকটা ক্লাবের মতো। পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা এলে সবাই মিলে তা সমাধানের চেষ্টা করেছি আমরা।

শ্রেয়া :একটা টিম হিসাবে অপারেট করেছি। আলাদা করে ভাবিনি। মা-বাবা এ দুজনকেও আলাদা বা এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দেখিনি।

ইত্তেফাক :সন্তানদের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের কথা তো শুনলাম। আপনার বাবার সম্পর্কটা কেমন ছিল?

আলী যাকের :আমি ছিলাম বাবাসর্বস্ব সন্তান। বাবার সঙ্গে আমার বয়সের তফাত ছিল তিন যুগের। ভয় করতাম, বাবা বাড়িতে থাকলে কথা বলতাম খুব কম। কিন্তু একটা অনুচ্চারিত টান, ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমার ইংরেজি শেখার পেছনে, সাহিত্য পড়ার পেছনে বাবার অবদান রয়েছে। সেই সঙ্গে মূল্যবোধগুলো তৈরি হওয়ার পেছনেও বাবা। যদিও মায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেশি ছিল। তবুও বাবাই ছিলেন আমার গড়ে উঠবার পেছনে মূল প্রেরণা।

আমি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার আগেই মা-বাবা দুই জনেই মারা যান। এরপর আমি আমার বড় দিদির ছায়ায় মানুষ হয়েছি। মা-বাবা মারা যাওয়ার পর আমি একটা নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পড়ি। পরিবারের সদস্যদের কাছে পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাকে গ্রাস করত। সেই আকাঙ্ক্ষা আমার আজও কাটেনি। সে কারণেই ছেলের নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করি। এটা ঠিক যে, ওরা স্বাধীন হবে। কিন্তু আমার যেন মনে হয়, এখনো ওদের কোলে বসিয়ে রাখব। এই প্রত্যাশা অজান্তেই আসে।

শ্রেয়া :বাবা কিন্তু কোনো কিছু আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয় না। কোনো কিছু মানা করতে হলে কায়দা করে বলে। আর বাবার সঙ্গে আমরা সহজেই যে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারি, গল্প করতে পারি।

আলী যাকের :আমার ছেলেমেয়েও আমাকে কোনো কিছু মানা করতে হলে কায়দা করে বলে। এটা আমি বুঝতে পারি, কিন্তু আমি যে বুঝতে পারছি সেটা আবার ওদের বুঝতে দিই না।

ইরেশ :বাবা তো একেবারেই মেয়ে-অন্তঃপ্রাণ। ছেলে যদি কিছু বলে সেটা বাতিল হবে। কিন্তু মেয়ে বললে সঙ্গে সঙ্গে তা মেনে নেওয়া হয়। মাঝেমধ্যে মজার ঘটনাও ঘটে। যেমন, বাবার ক্যামেরা কেনার একটা বাতিক আছে। বাবা একটা ক্যামেরা কিনেছে। আমি বললাম, এটা কেন কিনেছ; তার চেয়ে ঐ মডেলটা কিনতে? ব্যস, বিরক্ত হয়ে উঠল বাবা। আবার কদিন পরে আমার বলা মডেলটা কিনে এনেছে। বাবা মেয়ের কথা খুব শোনে। মেয়ে ক্যামেরা কিনতে মানা করেছে। বাবা ক্যামেরা কিনে এনে বলে, এই, তোমরা কিন্তু এটা শ্রেয়াকে বোলো না।

ইত্তেফাক :বাবার সমালোচনা করেন? খারাপ দিক ভালো দিক—যা মনে আসে বলতে পারেন।

শ্রেয়া :বাবার যে জিনিসটা আমি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করি তা হচ্ছে—ব্যক্তি আলী যাকের লোভী নয়। এটা আমাকে গর্বিত করে। মানুষ হিসেবে তার খ্যাতি, সুনাম এবং অর্থ-সম্পদের প্রতি লোভ নেই। যে কাজটা বাবা করতে ভালোবাসে সেটাই করেছে। জীবনে যা-ই করেছে ভালোবেসে করেছে—এটা আমাদের জন্য একটা বড় শিক্ষা। (খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে) আবার যদি জন্ম হয় তবে আমি চাইব এই পরিবারে, এই মা-বাবার কাছেই যেন জন্ম হয় আমার।

ইরেশ :আমার বাবা একজন ভালো মানুষ। খুব, খুব আবেগপ্রবণ মানুষ। যদি পুনর্জন্ম হয়, তাহলে মানুষ আলী যাকেরের বন্ধু হতে চাইব। একটি পুরো দিন শুধু তার সঙ্গেই কাটাতে চাইব।

n লেখক :সাংবাদিক