বিপ্লব বিশ্বাস
বিশ্বের সর্ববৃহত্ ডাটাবেস প্রতিষ্ঠান নাম্বিও (NUMBEO) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অপরাধপ্রবণ ১৩৩টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৬তম এবং সূচক ৬৩.৮২। তারপর মালদ্বীপের অবস্থান ৩৫তম, সূচক ৫৪.৬১; মিয়ানমারের অবস্থান ৫৩তম, সূচক ৪৬.৯৩; ভারতের অবস্থান ৬৫তম, সূচক ৪৪.৪২; পাকিস্তানের অবস্থান ৬৭তম, সূচক ৪৪.১৮; শ্রীলংকার অবস্থান ৮০তম, সূচক ৪০.২৩; আর নেপালের অবস্থান ৮৯তম এবং সূচক ৩৫.৬১। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো হলেও অপরাধপ্রবণতাই প্রমাণ করে দেশের উন্নয়নের সুফল জনগণ ভোগ করতে পারছে না। এই অবস্থার জন্য শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতাকেই দায়ী করলে চলবে না; বরং পারিবারিক, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, মানহীন শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রভাব ইত্যাদিও অনেকাংশেই দায়ী। অপরাধসমূহের মধ্যে পারিবারিক ও সামাজিক অপরাধের পাশাপাশি রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক দুর্নীতি এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলাও রয়েছে। আমাদের দেশে অপরাধ সংঘটনে দুর্নীতি ও মাদকের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। অথচ বছরের পর রছর কঠোর অভিযান চালিয়েও দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। কাজেই মাদক নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় হলো, ডোপ টেস্টের মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে মাদকাসক্তদের বর্জন করা আর দুর্নীতিবাজদের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা।
অনেকেই মনে করেন, আমাদের দেশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া বা অপরাধ দমন পদ্ধতিতে সংস্কার আনতে হবে। অপরাধীকে ধরে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে কারাগারে পাঠালেই সমাজ থেকে অপরাধ দূর হবে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে আবারো তারা একই অপরাধ করছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন মানুষ অপরাধী হয়ে জন্মগ্রহণ করে না; পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও রাজনৈতিক মদদ ইত্যাদি কারণে মানুষ অপরাধী হয়ে ওঠে। কিশোর অপরাধের প্রধান কারণই হলো বিশৃঙ্খল পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা। বেশিরভাগ পরিবারেই অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, যার প্রভাব সন্তানের ওপরেও পড়ছে। শুধু শাস্তি, জেল-জরিমানা ইত্যাদির দ্বারা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। মানুষকে অপরাধী হতে নিরুত্সাহিত করতে হবে। প্রতিটি সমাজেই অপরাধপ্রবণ কিছু ব্যক্তি রয়েছে যারা চিহ্নিত ও সবার কাছেই পরিচিত। কাজেই অপরাধ সংঘটনের আগেই অপরাধীকে প্রতিরোধ করতে হবে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সারা দেশে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও জ্ঞানী-গুণী মানুষদের সমন্বয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে শাসক বা নির্যাতকের ভূমিকা পরিত্যাগ করে অপরাধীদের সত্পথে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করা জরুরি। অপরাধ দমন করতে গিয়ে যেন অপরাধীর সৃষ্টি না হয় সেদিকেও সচেতন থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, একজন অপরাধীকে দমন করা যত কঠিন, তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা তত সহজ।
ফরিদপুর
