সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকিয়ে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার দুই মাস পর হলেও অভিযোগপত্র দিতে পারেনি পুলিশ। এমনকি ঘটনার পর প্রধান আসামি সাইফুরের কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধার মামলার চার্জশিটও দেওয়া হয়নি। গত ২৫ সেপ্টেম্বর জঘন্যতম এই ঘটনা ঘটে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার মামলার চার্জশিট দিতে বিলম্ব হওয়ায় সিলেটের সচেতন মানুষের মনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। আইনজীবীরা বলেছেন, এমন বিলম্ব আইনের বরখেলাপ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য শুক্রবার রাতে ইত্তেফাককে বলেন, তদন্ত কাজ প্রায় শেষ। ডিএনএ রিপোর্ট আসেনি। রিপোর্ট হাতে পেলেই অভিযোগপত্র প্রদান করা হবে। তদন্তের স্বার্থে আর কোনো মন্তব্য করতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে ঘটনার ভিকটিম ও তার পরিবার এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
এদিকে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহীন শুক্রবার সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে বলেন, দুই মাসেও এই মামলার অভিযোগপত্র দিতে না পারাটা আইনের লঙ্ঘন। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী এসব মামলায় আসামি হাতেনাতে ধরা পড়লে ১৫ দিনের মধ্যে এবং হাতেনাতে ধরা না পড়লে ৬০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র প্রদানের নির্দেশনা রয়েছে। এ ধরনের চাঞ্চল্যকর মামলায় ডিএনএ রিপোর্ট আসতে বিলম্ব কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, এটা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বা পুলিশ বিভাগের ব্যর্থতা।
বন্ধ থাকা ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ঐদিন রাত ৮টার দিকে স্বামী-স্ত্রীকে গাড়িসহ তুলে নিয়ে স্বামীকে বেঁধে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে। জঘন্য এই ঘটনায় ধর্ষণবিরোধী তীব্র আন্দোলন সিলেটসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ধর্ষণবিরোধী আইনও সংশোধন করে সরকার। অন্যদিকে সিলেটে পুলিশি নির্যাতনে রায়হান হত্যা ঘটনাটির কারণে চাঞ্চল্যকর ধর্ষণ মামলাটি কিছুটা চাপা পড়লেও ঐ জঘন্যতম ঘটনাটি একেবারে বিস্মৃত হয়নি। সচেতন মহল এই ঘটনার বিচারের অপেক্ষায় আছে। সিলেটে সনাক সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, আমরা আশা করেছিলাম সমাজে নাড়া দেওয়া এমন জঘন্য ঘটনার বিচার দ্রুত শুরু হবে। আসামিরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে। কিন্তু এখন দেখছি সেই পুরাতন নিয়মেই রয়েছে মামলার গতি। তিনি বলেন, জঘন্য ঘটনাবলির বিচার প্রলম্বিত হলে সমাজ হতাশ হয়।
২৫ সেপ্টেম্বর বিকালে নববিবাহিত স্ত্রীকে প্রাইভেটকারে করে শাহপরান মাজারের দিকে বেড়াতে গেলে ফেরার পথে সন্ধ্যার দিকে টিলাগড়ে এমসি কলেজের মূল ফটকের সামনে গাড়ি থামান স্বামী। এ সময় কয়েক জন যুবক গৃহবধূকে ঘিরে ধরেন। এক পর্যায়ে প্রাইভেটকারটিসহ দম্পতিকে কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায় যুবকরা। পরে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে প্রাইভেটকারের মধ্যেই সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়।
চার তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেশ
এই ধর্ষণের ঘটনায় হাইকোর্ট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও এমসি কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তিনটি কমিটিই প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ধর্ষণের ঘটনায় হাইকোর্ট থেকে সিলেটের জেলা ও দায়রা জজকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করলে কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে জমা দিলে শুনানি শেষে ২০ অক্টোবর প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেন হাইকোর্ট বেঞ্চ। এছাড়া কলেজ কর্তৃপক্ষ ২৬ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি ১০ অক্টোবর প্রতিবেদন জমা দেয়। ২৮ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বর সিলেট আঞ্চলিক কেন্দ্রের পরিচালক ড. মো. গোলাম রাব্বানীকে দিয়ে এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পাঁচ কার্যদিবস পর এই তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়।
