প্রযুক্তির অপব্যবহারে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২০, ২২:৪১

চলতি বছর প্রথম ১০ মাসে মোট ১ হাজার ৮৬ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রযুক্তির অপব্যবহারে বাড়ছে এসব ধর্ষণের ঘটনা। প্রযুক্তি বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পাশাপাশি স্বজনরা বসে থাকলেও কেউ কারো সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেন না। শুধু ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার ব্যবহারের কারণে। এ কারণে পরিবারে একে অপরের সঙ্গে যেমন বাড়ছে দূরত্ব তেমনি কমে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। পরিবারে বাবা-মায়েরা সন্তানদের প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন করছে না। খারাপসঙ্গ এবং অনলাইনে সহজ পর্নোগ্রাফির আগ্রাসনের কারণে ধর্ষণের মতো সামাজিক অপরাধ বেড়েই চলছে। এ ব্যাপারে সমাজ ও পরিবারের দায়িত্ববোধ আরো বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সতর্ক ও সচেতন থাকার কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিজ্ঞজনেরা।

তারা বলেছেন, বর্তমানে সমাজে নারীর প্রতি যে ভয়াবহ অবমাননাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে সংকট আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মুষ্টিমেয় কিছু কিশোর-তরুণ যারা ধর্ষণের মতো অপরাধ করছে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি মুষ্টিমেয় এ দুর্বৃত্তদের বাদ দিয়ে যারা ভালো তাদের প্রতিফলিত করতে হবে। আর খারাপ পথে যারা পা বাড়িয়েছে তাদের কারাগারে পাঠিয়ে দিতে হবে। দেশে কোনো ধর্ষণ ঘটলেই কেন বারবার শিক্ষার্থী ও নারী সমাজকে আন্দোলনে নামতে হবে? এ ধরনের ঘটনা থামাতে সরকারের দায়িত্বশীলদের কাজ করতে হবে। আবার এ ধরনের অপরাধ রোধে সরকার কিছুটা দেরিতে হলেও যে পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে তা যেন সত্যিকার অর্থে কার্যকর হয় এবং             আগামীতে এগুলো যেন না ঘটে সেদিকে সরকারসহ সবাইকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

নারী নেত্রী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সমাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বেড়ে যাওয়ার কারণেই ধর্ষণের মতো অপরাধ ঘটেই চলেছে। তারা আরো জানান, বর্তমানে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও অপব্যবহারের কারণে ধর্ষণ ও সামাজিক অপরাধগুলো বেড়ে গেছে। দেশে পর্নোগ্রাফি-সংক্রান্ত আইন তৈরি হলেও কোড অব কন্ডাক্ট, ইন্টারনেট কারা ব্যবহার করবে এবং এর নজরদারির বিষয়গুলো সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। এ ছাড়া এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অপরাধীকে দ্রুত কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশে নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, চলতি বছর সেপ্টেম্বরে ৩৪০ নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জন গণধর্ষণসহ ১২৯ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে প্রচলিত যে আইনগুলো রয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সামাজিক কাঠামোগত ধারণার পুনর্নির্মাণে কাজ করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, অপরাধীকে বয়কট করতে হলে সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে, নারীদের সম্পত্তিতে সমান অধিকার দিতে হবে; তাদের আত্মমর্যাদা ও আত্মশক্তিতে বলীয়ান হতে হবে, জেন্ডারবান্ধব সমাজ গড়তে এগিয়ে আসতে হবে। 

সম্প্রতি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৮৬ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৭৭ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫০ জনকে এবং আত্মহত্যা করেছেন ২৯ জন। উল্লেখ চলতি বছরের এই ১০ মাসের মধ্যে সাত মাসই করোনার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বন্ধ ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক রাশেদা ইরশাত নাসির বলেন, প্রযুক্তির ভালো দিক যেমন আছে, তেমন মন্দ দিকও আছে। সন্তান কার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করছে বা কার সঙ্গে চ্যাটিং করছে তা অভিভাবকের পক্ষে সব সময় জানা সম্ভব হয় না। কিশোর ও তরুণদের ভালো সময় কাটানোর জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা না করে দেওয়ায় সমাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বাড়ছে। ফলে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধগুলোও বেড়ে যাচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী সালমা আলী বলেন, বিকৃত যৌনতার কারণেই ধর্ষণ হচ্ছে। আগে যখন প্রযুক্তি সহজলভ্য ছিল না তখন এত ধর্ষণ দেখা যায়নি। কিন্তু প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও অপব্যবহারের কারণে সমাজে ধর্ষণ ও সামাজিক অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, যেসব সংস্থা নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কাজ করছে যেমন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, পুলিশকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে স্বচ্ছতার সঙ্গে। আমরা চাই, সব সেক্টরের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ও সহযোগিতা। সবচেয়ে বড় কথা নারীদের মর্যাদা দিতে হবে।