করোনা কেড়ে নিল আরো এক নক্ষত্রের প্রাণ। ‘কবর’ নাটক দিয়ে পেশাদারি মঞ্চে যিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন, করোনা আক্রান্ত হয়ে সেই কবরেই ঠাঁই হলো তার। চলে গেলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের। গতকাল শুক্রবার সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন বরেণ্য এই অভিনেতা (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। জীবনভর আলী যাকেরের সব কর্মকাণ্ডের প্রেরণা ছিল দেশপ্রেম। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা, অভিনয়—সবকিছুতেই বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা তাকে চালিত করেছে। মঞ্চে অসাধারণ অভিনয় দিয়ে তিনি মানুষের হূদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। টেলিভিশন নাটক তার খ্যাতি এনে দিলেও মঞ্চে অভিনয়ের দিকপাল হিসেবে মানুষ তাকে কখনোই ভুলবে না। আলী যাকের অভিনয়ের পাশাপাশি দেশীয় বিজ্ঞাপনশিল্পেরও একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বাংলাদেশের শীর্ষ বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটির কর্ণধার ছিলেন তিনি। বহুগুণে গুণান্বিত একজন ব্যক্তি ছিলেন আলী যাকের। এসব কাজের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের আগে ইংরেজিতে ক্রিকেটের ধারাভাষ্যও দিয়েছেন তিনি। এছাড়া যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সদস্য ছিলেন।
বেশ কয়েক বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন আলী যাকের। চলছিল থেরাপি। গেল সপ্তাহে হঠাত্ শারীরিক জটিলতা বাড়লে হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। এরপর কিছুটা সুস্থ বোধ করায় গত শনিবার বাসায় ফিরে যান তিনি। এরপর সোমবারে টেস্ট রিপোর্টে জানা যায়, তিনি করোনা পজিটিভ। ক্যানসার আক্রান্ত শরীর করোনার ধাক্কা আর সামাল দিতে পারেনি।
এই গুণী অভিনেতার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ একজন বরেণ্য অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হারাল। শেখ হাসিনা বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ, দেশের শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলী যাকেরের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
গতকাল বেলা ১১টার দিকে আলী যাকেরের মরদেহ নিয়ে আসা হয় আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে। সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে সেখানে। করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করায় এ সময় মানুষের আসা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সেখানে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলী যাকেরকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। আলী যাকেরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মরদেহ নেওয়া হয় তার কর্মস্থল এশিয়াটিক সেন্টারে। পরে বাদ আসর নামাজে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।
আলী যাকেরের স্ত্রী নাট্যজন সারা যাকের বলেন, ‘আমার দীর্ঘদিনের সহযাত্রী ছিলেন, সহকর্মী ছিলেন, বন্ধু ছিলেন। বাসা থেকে শেষ যখন তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য বের করা হচ্ছিল তখন লিফটে উঠে তিনি আমাকে খুঁজছিলেন। তিনি যে আমার ওপরে এতটা নির্ভরশীল, এটা আমি আগে এমন তীব্রভাবে বুঝতে পারিনি। আলী যাকেরের সর্বশেষ ইচ্ছা ছিল “গ্যালিলিও” নাটক করার। সেটা সম্ভব হয়েছে। তার শেষ ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে। আমাদের দুজনের জীবনের দীর্ঘ যাত্রায় যারা পাশে ছিলেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তাকে শ্রদ্ধা জানান সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আলী যাকেরের মরদেহের পাশে উপস্থিত ছিলেন স্ত্রী সারা যাকের, ছেলে ইরেশ যাকের, মেয়ে শ্রেয়া সর্বজয়া, দীর্ঘদিনের বন্ধু সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, ডা. সারোয়ার আলী ও মফিদুল হক।
এ সময় শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন নাট্যজন মামুনুর রশীদ, ফেরদৌসী মজুমদার, রামেন্দু মজুমদার, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা, নজরুলসংগীত শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেন প্রমুখ।
এ সময় আরো শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ঢাকা জেলা প্রশাসন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, যুব ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন, থিয়েটার, স্রোত আবৃত্তি সংসদ প্রভৃতি মরদেহে শ্রদ্ধা জানায়।
সংক্ষিপ্ত জীবনী :১৯৪৪ সালের ৬ নভেম্বর চট্টগ্রামের রতনপুর ইউনিয়নে জন্ম আলী যাকেরের। ১৯৭২ সালে তিনি আরণ্যক নাট্যদলের হয়ে মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। ১৯৭২ সালের জুন মাসের দিকে আতাউর রহমান ও জিয়া হায়দারের আহ্বানে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে যোগ দেন। ঐ দলে তিনি আতাউর রহমানের নির্দেশনায় ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন, যার প্রথম মঞ্চায়ন হয়েছিল ওয়াপদা মিলনায়তনে। ১৯৭৩ সালে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে তিনি প্রথম নির্দেশনা দেন বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ নাটকে, যা ছিল বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাট্য প্রদর্শনীর যাত্রা। এছাড়াও ‘সত্ মানুষের খোঁজে’, ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ম্যাকবেথ’সহ অনেক আলোচিত মঞ্চনাটকের অভিনেতা ও নির্দেশক তিনি। পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেও তিনি পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। ‘আজ রবিবার’, ‘বহুব্রীহি’, ‘তথাপি’, ‘পাথর’, ‘দেয়াল’সহ বহু নাটকে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন আলী যাকের। বেতারে ৫০টির বেশি নাটক করেছেন তিনি। অভিনয় করেছেন বেশকিছু চলচ্চিত্রে। এছাড়া টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখেছেন, করেছেন শখের ফটোগ্রাফি। লেখালেখিও করেছেন।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আলী যাকের নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সভাপতি ছিলেন। তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার, সম্মাননা। পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা।
শোক প্রকাশ :এই দিকপাল অভিনেতার মৃত্যুতে আরো শোক জানিয়েছেন—তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমু, কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান, শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. আশরাফ আলী খান খসরু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক ও উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জি এম কাদের, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনু, শান্তি পরিষদের সভাপতি মোজাফফর হোসেন পল্টু ও সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান খান, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু আহম্মেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির প্রমুখ।
জেপির শোক :আলী যাকেরের মৃত্যুতে জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। নেতৃদ্বয় বলেন, আলী যাকের বিগত চার দশক ধরে এদেশের নাটক, চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সদর্পে বিরাজ করেছেন। তিনি প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার মৃত্যুতে দেশ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দেশপ্রেমিক এবং একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হারাল। তারা মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।
