‘বাংলা নাটকের একটি স্তম্ভের মৃত্যু হলো’

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২০, ২২:৪৪

 ‘৫০ বছরের সম্পর্ক ছিল আমাদের। আজকের আসাদুজ্জামান নূর হয়েছি শুধু আলী যাকেরের জন্য। আমাদের দুজনের যে বন্ধন এটা বাংলাদেশে বিরল। বন্ধুত্বের সম্পর্ক, ব্যাবসায়িক সম্পর্ক—কোনো কিছুতে কখনোই কোনো বিরোধ হয়নি আমাদের। বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছাপিয়ে স্বার্থ কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।’ অনেকটা স্বগতোক্তির মতো কথাগুলো বলছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর। গতকাল শুক্রবার সকালে তখনো আলী যাকেরের মরদেহ এসে পৌঁছায়নি। তবে বন্ধু-স্বজনরা এসে ভরে গেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণ।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি ডা. সারোয়ার আলী চোখের পানি সংবরণ করতে পারছিলেন না। কান্না চেপে রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘এক বছরের মধ্যে আমাদের তিন ট্রাস্টি চলে গেলেন। প্রথমে রবিউল হুসাইন, এরপর জিয়াউদ্দিন তারিক আলী আর এখন আলী যাকের। এটা আমাদের জন্য বড় বেদনার। আলী যাকেরের মৃত্যুতে আমি, আমাদের বন্ধুরা বিপন্ন বোধ করছি।’ সারোয়ার আলী বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর যখন আমরা শুরু করি, তখন আলী যাকের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ব্যক্তি যে-ই হোক না কেন, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত আমরা সবার অবদানকেই তুলে ধরব। এই সিদ্ধান্তের কারণে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরবর্তীকালে অনেক বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পেরেছে।’

নাট্যজন মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় ‘কবর’ নাটকেই প্রথম মঞ্চে অভিনয় করেছিলেন আলী যাকের। তিনিও এসেছিলেন আলী যাকেরকে শেষ বিদায় জানাতে। শোকগ্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বললেন, ‘আলী যাকেরের মৃত্যুতে বাংলা নাটকের একটি স্তম্ভের মৃত্যু হলো। দুই বাংলায় যে কজন বাংলা নাটকের স্বরূপ চিনেছিলেন, আলী যাকের তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। বাংলা নাটকের প্রারম্ভিক কালে বাংলা নাটকের উত্থান ঘটেছিল যাদের হাত ধরে, আলী যাকের তাদের অন্যতম। মঞ্চে তার অভিনীত চরিত্রগুলো অবিস্মরণীয়। তিনি মঞ্চে প্রভাব সৃষ্টি করতে পারতেন। অনেকেই জনপ্রিয়তা লাভ করেন কিন্তু আলী যাকেরের যা অর্জন, তা খুব কম অভিনেতার জীবনে ঘটে। অনেকেই গত হয় কিন্তু কেউ কেউ বিগত হন না। বেঁচে থাকেন। আলী যাকেরও বেঁচে রইবেন আমাদের মধ্যে।’

এসেছিলেন ফেরদৌসী মজুমদার ও রামেন্দু মজুমদার। সঙ্গে ছিল মেয়ে ত্রপা মজুমদার। ফেরদৌসী মজুমদার বললেন, ‘আমরা কী হারিয়েছি, কাকে হারালাম—তা ধীরে ধীরে টের পাব। দেশপ্রেম ছিল আলী যাকেরের প্রেরণা। দেশ ছাড়া কিছু বুঝতেন না।’

রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘২০২০ সাল হচ্ছে আমাদের প্রিয়জনকে হারানোর বছর। আলী যাকেরের মতো এত বড় মাপের অভিনেতা আমরা আর পাব না। “গ্যালিলিও”, “নূরলদীনের সারাজীবন” তাকে ছাড়া কল্পনা করা যায় না। আমরা “প্রেমপত্র” নামে একটি নাটক আলী যাকের ও ফেরদৌসী মজুমদারকে নিয়ে করবার পরিকল্পনা করেছিলাম। দুই বছর ধরে তার জন্য প্রতীক্ষা করছিলাম। কিন্তু সেটা সম্ভব হলো না।’

নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, বাংলা মঞ্চে আলী যাকেরের চরিত্রের শেষ নেই। ‘গ্যালিলিও’, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্?সা’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ নাটকে নামভূমিকায় অভিনয় তারই ধ্রুপদি উদাহরণ। চরিত্রকে তিনি উচ্চমার্গীয় পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।