এই বাড়াবাড়ির পেছনে কী

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২০, ২১:৩২

এই ধরনের ঘটনা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নহে, নূতন করিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ-উত্তেজনা জাগাইবার পিছনে বড় ধরনের উসকানিও বটে। শুক্রবার দিনটিকে মুসলিম বিশ্ব ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হইতে অধিক মর্যাদা দিয়া থাকে; কিন্তু এই দিনটিতেই ইসলামিক রিবাপলিক অব ইরানে এক ভয়ানক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে। দেশটির শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী মহসেন ফখরিজাদেহ্ গুপ্ত হত্যার স্বীকার হইয়াছেন। পরমাণু প্রকল্পের পাশাপাশি তিনি ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন বিভাগের প্রধান ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড ইসরাইল সংঘটিত করিয়াছে বলিয়া অভিযোগ করিয়াছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। সময় মতো জবাব দেওয়া হইবে বলিয়াও তিনি হুঁশিয়ারি দিয়াছেন। যদিও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইসরাইলের পক্ষ হইতে স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করা হয় নাই। তবে কিছুকাল আগেই ইসরাইল তাহাকে পরমাণু অস্ত্র প্রকল্পের মূল হোতা বলিয়া অভিযোগ করিয়াছিল। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ইরানের পরমাণু প্রকল্পের মূল হোতা উল্লেখ করিয়া তাহার জাতিকে ফখরিজাদেহ্্র নামটি স্মরণে রাখিতে বলিয়াছিলেন।

কাহারা এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে রহিয়াছে উহা আমরা এখনি বলিতে চাহি না। তবে ইহা সেই গানের কলির মতো, ‘যে কথা যায় না বলা শুধু বোঝা যায়।’ বুঝিতে মোটেই অসুবিধা হয় না যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির বদলে বৈরিতার প্রতি যাহাদের উদ্দেশ্য, ইহা তাহাদেরই কাজ। ভাবুকেরা বলিতেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের সহিত যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনও জড়াইয়া আছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট পার্টির তত্কালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নেতৃত্বে জয়েন্ট কমপ্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন গৃহীত হয়, যাহা সাধারণ ভাষায় ইরান নিউক্লিয়ার ডিল নামে পরিচিত। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই ডিল হইতে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করিয়া নেয়। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরাজয় নিশ্চিত হইয়া গিয়াছে। ২০ জানুয়ারি ক্ষমতার পালাবদল ঘটিবে। ধারণা করা হইতেছে, ইরানের সহিত প্রেসিডেন্ট বাইডেন আবার নিউক্লিয়ার ডিলে ফিরিয়া আসিবেন। তাই ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়িবার পূর্বেই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হইল, যাহাতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ও সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া কঠিন হইয়া উঠে। এই বত্সরেই ৩ জানুয়ারি আমরা দেখিয়াছি, ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় জেনারেল কাশেম সোলেইমানিকে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে প্রকাশ্যে ড্রোন হামলা করিয়া হত্যা করা হয়।

বৃহত্ শক্তিগুলিকে আমরা এইরূপ নিরীহ মানুষ হত্যা করিয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দা তুলিতে দেখিয়া আসিতেছি। এই বাড়াবাড়ির শেষ হওয়া দরকার ছিল; কিন্তু সেই আশা পরাহতই থাকিয়া যাইতেছে।

মুদ্রার উলটা দিকও যে নাই তাহা নহে। ইসরাইল রাষ্ট্রটি গঠিত হইয়াছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইহুদিদের আবাসভূমি হিসাবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্তে যখন দেশটি প্রতিষ্ঠা পায়, তখনই চূড়ান্ত মীমাংসা হইতে পারিত; কিন্তু তত্কালীন মুসলিম দেশগুলি তাহা কোনোক্রমেই মানিল না, বরং বিভিন্ন সময়ে ইসরাইলকে শক্তি প্রয়োগ করিয়া উচ্ছেদের পথে হাঁটিল। পরবর্তী সময়ে অন্তত তিনটি যুদ্ধে জড়াইয়া পড়িয়াছিল ইসরাইল ও মুসলিম কয়েকটি দেশ; যাহার ফলে ফিলিস্তিন, মিশর ও সিরিয়াকে ভূমি হারাইতে হইয়াছে। ইহার বদলে ইসরাইলকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করিতে চেষ্টা করিলে বরং আরব বিশ্বের জন্য সুফল আসিত বলিয়া অনেকে মনে করেন।