কবে মিলবে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২০, ২১:৩৩

হিজড়া একটি মধ্যপ্রাচীয় শব্দ, ভারতবর্ষে হিজড়া শব্দের বহুল প্রচলন শুরু হয় মোগল আমলে। তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত, দমিত ও নিগৃহীত একটি শব্দ। জন্মগতভাবে বিশেষ অঙ্গহানির কারণে তাদের হিজড়া হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সমাজের কোনো ক্ষেত্রে তাদের বিচরণের সুযোগ নেই। আমাদের সমাজ কোনোভাবে মেনে নিতে পারে না তাদের। হিজড়া হয়ে জন্ম নেওয়া যেন তাদের আজন্ম পাপ। অথচ এটা ঘটে থাকে প্রকৃতিগতভাবে, এখানে থাকে না মানুষের কোনো হাত। তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া প্রকৃতপক্ষে নারী-পুরুষের বাইরে আল্লাহর সৃষ্টি আরো একটি লিঙ্গ। তবুও তারা সমাজের চোখে বোঝা। কিছু কিছু মানুষ তো হিজড়াদের মানুষ ভাবতেই নারাজ।

আমাদের চলার পথে প্রতিনিয়তই দেখা মেলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের। অনেক সময় তারা জোর করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করে। এতে কমবেশি বিরক্ত হই আমরা সবাই। অথচ একবারও ভাবি না, কেন তারা করছে এই কাজ! এর পেছনে কি কি কারণ থাকতে পারে। আমাদের সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের জন্য নেই কোনো কর্মক্ষেত্র। একজন শিশু তৃতীয় লিঙ্গের হয়ে জন্ম গ্রহণের পর তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় হিজড়া পল্লিতে। এরপর আর পিতামাতা তার কোনো খোঁজ রাখেন না। তারা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সার মতো মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। একজন মানুষ হিসেবে ন্যূনতম জীবন যাপনের জন্য যা প্রয়োজন সেসবকিছু থেকেই বঞ্চিত তারা।

অথচ উন্নত বিশ্বে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য রয়েছে আলাদা কর্মক্ষেত্র। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কেরালা রাজ্যে হিজড়া সম্প্রদায়ের জন্য ২০১৭ সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে ‘সহজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’ নামের একটি স্কুল। ২০১৫ সঙ্গে ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের রায়গড়ের মেয়র নির্বাচিত হয় হিজড়া সম্প্র্রদায় থেকে মধু বাই কিন্নর (সূত্র :ডয়েচে ভ্যালি)। এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে হিজড়াদের অংশগ্রহণ সহজে চোখে পড়ে। এ চিত্র শুধু ভারতে নয়, বিভিন্ন উন্নত দেশে তৃতীয় লিঙ্গের জন্য রয়েছে শিক্ষার সুযোগ, রয়েছে কর্মক্ষেত্রের সুযোগ। সর্বোপরি, সেসব দেশসমূহ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সামাজিক স্বীকৃতি দানে সক্ষম।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা ১০ হাজার, তবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যমতে এর সংখ্যা অনেক বেশি। বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ভাগ্য বদল হয়নি তাদের। সমাজের চোখে এখনো অবাঞ্ছিত তারা। এখনো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য সহজ নয় আমাদের সমাজব্যবস্থা। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫ (ঘ) ধারায় তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়াদের অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর তেমন কোনো প্রয়োগ নেই। তৃতীয় লিঙ্গের জন্য নেই আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আলাদা কর্মক্ষেত্র। তাই তাদের মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নেচে-গেয়ে উপার্জন করে চালাতে হয় জীবন। শুধু দৈহিক গঠনের কারণে তারা সমাজের সব অধিকার থেকে বঞ্চিত।

কিন্তু এরপরও আশার আলো দেখাচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠান, সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয় তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী থেকে নিয়োগ দিয়েছে তাদের নিরাপত্তাকর্মী। এছাড়াও রাজধানী ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের লোহার ব্রিজ এলাকায় ‘দাওয়াতুল কুরআন’ নামের তৃতীয় লিঙ্গের জন্য নির্মিত হয়েছে একটি মাদ্রাসা। যা অবশ্যই তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের জন্য তো বটেই, সাধারণ মানুষের জন্যও একটি খুশির খবর। বর্তমান সরকার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য প্রদান করা শুরু করেছে বিভিন্ন ভাতা। এভাবেই যদি সমাজ তথা রাষ্ট্র তৃতীয় লিঙ্গের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দেন, তবেই তারা ফিরে পাবে তাদের মৌলিক অধিকার এবং সমাজের বাকি ১০ জনের মতো জীবন যাপনের সুযোগ। এর ফলে তারা স্বাবলম্বী হবে এবং দেশ ও জাতির সম্পদে পরিণত হবে। তাই আসুন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের হিজড়া হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখি। নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে, তবেই বদলে যাবে আমাদের সমাজের অবহেলিত সম্প্র্রদায়ের মানুষের জীবন। কেননা লিঙ্গ কখনো মানুষের একমাত্র পরিচয় হতে পারে না, কর্মের মধ্যেই নিহিত থাকে মানুষের মূল পরিচয়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়