বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে সোমা ছিলেন সবার ছোট। আদরের এ মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল পরিবারের। কিন্তু মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় দরিদ্র পরিবারটির সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। গতকাল বুধবার কলেজে যাওয়ার পথে রাস্তা পার হতে গিয়ে কাভার্ড ভ্যানের চাপায় মারা গেছে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের একাদশ শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী সোমা বড়ুয়া। সকালে নগরীর কোতোয়ালি মোড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর পুলিশ কাভার্ডভ্যানসহ চালক মোঃ জসিম উদ্দিনকে গ্রেফতার করেছে। গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল।
জানা গেছে, কলেজ থেকে সোমাদের বাসা প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে চান্দগাঁও বাহির সিগন্যাল এলাকায়। প্রতিদিন তিনি বাসে করে কলেজে আসা-যাওয়া করতেন। অন্যান্য দিনের মতো গতকাল সকালে কোতোয়ালি মোড়ে বাস থেকে নেমে রাস্তা পার হচ্ছিলেন সোমা। এ সময় একটি কাভার্ড ভ্যান তাকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই নির্মমভাবে মারা যান তিনি। তাকে দ্রুত চমেক হাসপাতালে নেয়া হলেও চিকিত্সকদের তখন আর কিছুই করার ছিল না। পরে পরিবারের ইচ্ছায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই সোমার লাশ তার আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকালে চান্দগাঁও সিএন্ডবি বড়ুয়া পাড়ায় তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
সোমার মৃত্যুর পর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে এক হূদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে সোমার মায়ের আহাজারি আর স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। সোমার মা একটু পরপরই জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। তাকে সান্ব্তনা দিতে গিয়ে সোমার সহপাঠীরাও বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। সোমার চাচাত ভাই পিপলু বড়ুয়া ইত্তেফাককে বলেন, সোমা খুবই দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। তার বাবা রূপায়ন বড়ুয়া অসুস্থতার জন্য কোনো কাজ করতে পারেন না। মা কুমকুম বড়ুয়া একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। তার সামান্য আয়েই সংসার চলে। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেও ছোট মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার ইচ্ছা ছিল তাদের। তাই দুই বেলা কোনোমতে নূনভাত খেয়ে মেয়ের পড়ার খরচ জোগাতেন মা। আশা ছিল মেয়ে একদিন বড় চাকরি করে বাবা-মায়ের দুঃখ ঘোচাবে। কিন্তু মা-বাবার একমাত্র আশার প্রদীপ নিভে গেছে।
এ দিকে সহপাঠীরা বন্ধুর অকাল মৃত্যুতে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। সরকারি সিটি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক শরমীন নীপু ইত্তেফাককে জানান, নগরীতে দিনের বেলায় ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধের আইন কার্যকর করার জন্য সিএমপি কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কলেজের শিক্ষার্থীরা। কলেজের অধ্যক্ষ ঝর্ণা খানম বলেন, মেধাবী ছাত্রী সোমার অকাল মৃত্যু মেনে নেয়া কষ্টকর। আমরা প্রশাসনের কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও সোমার অসহায় পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।
