মানতে কষ্ট হয়

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২০, ২২:১১

ঝরাপাতার মতো গত কয়েক মাসে জীবনবৃক্ষ থেকে ঝরে গেল কত প্রিয়জন। তাদের সঙ্গে আমার মতো এক নগণ্য মানুষের শুধু আবেগের সম্পর্ক ছিল, তা নয়। তারা ছিলেন সমাজের বাতিঘর। নিজ নিজ বলয়ে যারা আলো ছড়িয়েছেন। তাদের আলোজ্বালা পথে হেঁটেছেন অনেকে। হাঁটছেন। আগামী দিনেও হাঁটবেন। সৌভাগ্য আমার, আমি তাদের গভীরভাবে চিনতাম; একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, নির্মাণের কর্মযজ্ঞে সঙ্গী হতে পেরেছি। প্রিয়জন হারানোর শোক সইতে সইতে এখন পাথর হওয়ার অবস্থা। সর্বশেষ শোকাঘাত সইতে হলো গত সাতাশে নভেম্বর, নাট্যজন আলী যাকেরের আকস্মিক চলে যাওয়ায়। জানি, জীবনের অমোচনীয় নিয়মে একদিন সবাইকেই চলে যেতে হয়। এটাই অমোঘ বিধান। তবু সব চলে যাওয়াকে মানা যায় না। মানতে কষ্ট হয়। মাত্র কদিন আগে প্রিয়বন্ধু সাংবাদিক খোন্দকার মুনীরুজ্জামানের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ অবস্থা কাটিয়ে না উঠতেই আরেক মহিরুহের পতনে প্রায় বাকরুদ্ধ আমি। আঘাতের পর আঘাতে সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকা কঠিন। অসম্ভবও। কয়েক মাসের ভেতর পৃথিবী কী নিদারুণ বদলে গেছে। ঘরে-বাইরে সব সম্পর্কই নতুন, পরিস্থিতি নতুন, চিন্তাভাবনাও নতুন। কেবল প্রিয়জন হারানোর শোকানুভূতি অবিকল আগের মতো গভীর ও অসহনীয়। বুকের ভেতর শোকের জল টলটল করে। অনেকেই তা দেখে না। দেখানোও যায় না।

বয়সের পার্থক্যে আমরা ছয় বছরের ছোট-বড়। আমার অন্যতম অগ্রজ বন্ধুদের একজন ছিলেন তিনি। আলী যাকেরকে কখনো তার পোশাকি নামে সম্বোধন করেছি বলে মনে পড়ে না। প্রায় পঞ্চাশ বছরের সম্পর্ক। সম্পর্কের শুরুতেই ছোটলু ভাই আজ যে নেই, তবু তিনি আমার ছোটলু ভাই। ঘরের বড় ভাইকে যেমন আমরা তুমি সম্বোধন করি, তেমনিভাবে ছোটলু ভাইকেও সম্পর্কের শুরু থেকে তুমি সম্বোধন করে এসেছি। তাতে বিন্দুমাত্র সম্ভ্রম ও সম্মানের কমতি হয় নাই।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের একেবারে শুরুতেই মঞ্চনাটক নিয়ে তুমুল কর্মযজ্ঞ শুরু হলো। নাটকের ভালো স্ক্রিপ্ট নেই, উপযোগী মঞ্চ নেই। নাট্যসংগঠন নেই। কুছ পরোয়া নেহি। মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনা তো আছে! বিশাল যুদ্ধজয়ের দুঃসাহস তো আছে! শুরু হলো কাজ। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় মুক্তিযুদ্ধের আগেই তৈরি হয়েছিল প্রয়াত অধ্যাপক জিয়া হায়দারের উদ্যোগ ও নেতৃত্বে। স্বাধীনতার পরপরই একে একে তৈরি হলো থিয়েটার, বহুবচন, ঢাকা থিয়েটার, আরণ্যক নাট্যদলের। সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর তত্ত্বাবধানে নাট্যচক্র। একসঙ্গে এতগুলো নাট্যদলের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হলো চট্টগ্রামের থিয়েটার ৭১ এবং তির্যক। বাংলা নাটকের শিল্পবৃক্ষে সুবর্ণপুষ্প ফোটাবার সে এক মহা কর্মযজ্ঞ। এই কর্মযজ্ঞের ভেতরইে নব যাত্রাপথের বন্ধুদের একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক। সম্পর্কের বন্ধন আপন সহোদরের চেয়েও শক্ত। ছোটলু ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তখন থেকে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আর ছোটলু ভাই ইস্ট এশিয়াটিক বিজ্ঞাপনী সংস্থার কর্তাব্যক্তি। মতিঝিলের পাট ভবনে অফিস। কেউ কারো প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে সবাই যেন পরস্পরের সহযোগী। গ্রুপ থিয়েটারের চর্চা আমাদের সবাইকে এক পরিবার করে ফেলল। নাটক নিয়ে আড্ডা, নাটক নিয়ে তর্ক, নাটক নিয়ে পড়াশোনা, নাটকের ভবিষ্যত্ আকার নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের মতপার্থক্য। তবে সবকিছুর পরে বাংলা নাটকের জয়ধ্বজা ওড়াবার স্বপ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ। ছোটলু ভাই অগ্রজ ছিলেন বটে কিন্তু নাটক কিংবা শিল্পসাহিত্যের আড্ডায় ছেলেমানুষি তর্ক। তার সব কথা, যুক্তি বেশির ভাগ সময়েই মানতাম না। তাই বলে ছোটলু ভাই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে দীর্ঘ সময় মুখ ফিরিয়ে থাকতেন না। খানিক বাদেই প্রাণখোলা হাসি দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরতেন।

ছোটলু ভাইয়ের সঙ্গে কোনো মঞ্চনাটকে অভিনয় করার সুযোগ আমার হয়নি। তবে অন্যান্য মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করেছি। মোরশেদুল ইসলাম ছাত্রাবস্থায় যখন বিকল্পধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করল, তখন ছোটলু ভাই ও আমি সেই চলচ্চিত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। মোরশেদুল ইসলামের সেই চলচ্চিত্রটির নাম ‘আগামী’ এবং এটি বাংলাদেশের প্রথম বিকল্পধারার চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি বিদেশের এক উত্সবে পুরস্কৃত হয়েছিল।

পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বেশি কিছু সুখকর বিষয় ছোটলু ভাই নিজ জীবনচর্যায় গ্রহণ করেছিলেন, যা তার ব্যক্তিত্বকে আকর্ষণীয় করেছিল বললে ভুল হবে না। চলনে, বলনে, রুচিতে, আচরণে তিনি যে সফিস্টিকেসি রপ্ত করেছিলেন তা পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকেই পাওয়া। তবে রাবীন্দ্রিক বাঙালিয়ানাকেও তিনি হাতছাড়া করেন নাই। দেবে আর নেবে তত্ত্বকে তিনি নিজ জীবনের নিত্যদিনের চর্চায় এমনভাবে গ্রহণ করেছিলেন যে তাকে কখনোই বাহুল্য মনে হয় নাই। বরং সুন্দরতর হয়েছিলেন তিনি। ছোটলু ভাইয়ের কালচার্ড ব্যক্তিত্বের ভাবমূর্তি কখনো কি জনপ্রিয় নাট্যব্যক্তিত্বের সমান্তরাল হয়ে যেত। অথবা ব্যবসায়ক্ষেত্রের ঈর্ষণীয় সাফল্যের পেছনেও কি কোনো ভূমিকা রেখেছে! কে জানে।

ছোটলু ভাই যে অন্যের কাজকে প্রশংসা করতে কার্পণ্য করতেন না তা আমি নিজ অভিজ্ঞতা থেকেই নির্দ্বিধায় বলতে পারি। মঞ্চে বা টেলিভিশনে আমার অভিনয় ভালো লাগলে আকাতরে প্রশংসা করতেন। এমনকি আাামার কোনো লেখা পড়েও তিনি ফোন করে প্রশংসা করতেন। আবার ভুল কিছু চোখে পড়লে তা শুধারও দিতেন। যেমন ক্রিকেট নিয়ে একটা লেখায় আমি অস্ট্রেলিয়ার বিল লরি আর ববি সিমসন বিষয়ে একটা ভুল তথ্য লিখেছিলাম। ছোটলু ভাই শুধরে দিয়েছিলেন।

ক্রিকেট তার ভুবনের এক পছন্দের ক্ষেত্র ছিল। নিজে একসময় ক্রিকেট খেলেছেন। পরবর্তী সময়েও ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকারও হয়েছিলেন। ক্রিকেটটাকে ভালো বুঝতেন। এটাই হচ্ছে ছোটলু ভাইয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং শিক্ষণীয় গুণ। যেটা করতেন সেটাই বুঝে করতেন।

যখন শৌখিন ফটোগ্রাফি করেছেন বিখ্যাত ফটোগ্রাফার ড. নওয়াজিশ আহমেদের সঙ্গে জুটি বেঁধে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশময়। তখন সেটাও করতেন আন্তরিকতার সঙ্গে শতভাগ বুঝেশুনে।

অচেনা উদ্ভিত সম্পর্কে জানতে অথবা পথপাশে ফুটে থাকা বুনোফুলেও তার নজর ছিল পাঠশালার ছাত্রের মতো। প্রকৃতি, বৃক্ষরাজি, লতাগুল্ম ইত্যাদির প্রতি গভীর মমতার বিষয়টি আমি নিজে চাক্ষুস করেছি। এসবের কত যে ছবি তুলেছেন নিজের প্রিয় ক্যামেরায়! এই লতাগুল্ম, বৃক্ষরাজি—যারা ছোটলু ভাইয়ের স্নেহের স্পর্শ পেয়েছে, তারা কি তার চিরবিদায়ের খবর জানে—জানলে কি শ্রদ্ধায় মাথা নোয়াবে তারা! চলতে পথে যে মটরশুঁটি পা জড়িয়ে ধরত সে কি তার ছোটলু ভাইয়ের অপেক্ষায় শিশিরে শরীর ভিজিয়ে অপেক্ষা করবে! অথবা যেসব ছোট্ট কিশলয় ছোটলু ভাইয়ের আদর-যত্নে বড় হয়েছে, তারাও কি আজ শোকে মুহ্যমান! কে জানে! হবে হয়তো! বৃক্ষও তো অনেক বোঝে। কেবল প্রকাশ করতে পারে না।

আটের দশকের শুরুর দিকে একবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়েছিলাম একসঙ্গে নাটক বিষয়ে একটা আলোচনাসভায়। ফেরার পথে রাত হয়ে যাওয়ায় ঢাকাগামী একটা ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করে ভিড়ের ধাক্কায় প্রায় ব্যর্থ হলাম। বিশালদেহী ছোটলু ভাই এবং আমিও তখন সুঠামদেহী যখন ব্যর্থ হলাম, তখন স্থানীয় আয়োজকরা ট্রেন আটকে রেখে আমাদের দুজনকে সর্বশেষ বগির শেষে ছোট্ট গার্ডরুমে উঠিয়ে দিল। গার্ড সাহেবের জন্য বসার একটা মাত্র ছোট টুল। আমরা দুজন ঢাকা পর্যন্ত সমস্ত পথ দাঁড়িয়ে ঝগড়া করতে করতে ফিরলাম। ঝগড়ার কারণ আলোচনাসভায় আমি কেন জাতীয় নাট্য আঙ্গিক বা দেশীয় নাট্য আঙ্গিক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাজনীতিকদের মতো অনেকটা উচ্চকণ্ঠ হয়েছিলাম। এটা একজন সংস্কৃতিকর্মীর জন্য বেমানান। সেদিন কয়েক ঘণ্টা চলন্ত ট্রেনের শব্দ ছাপিয়ে উচ্চকণ্ঠে ঝগড়া করতে করতে কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছে সব ভুলে গেলাম দুজনে। গলাগলি ধরে যে যার গন্তব্যে। কিন্তু আজ, অনেক বছর পর আমিও ছোটলু ভাইয়ের মতো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একজন সংস্কৃতিকর্মীর বক্তৃতার ভাষা অবশ্যই স্বতন্ত্র, প্রাঞ্জল ও সুশ্রুত হতে হবে এবং সেটাই তার স্বকীয়তা এবং দর্শক বা শ্রোতাকে আকর্ষণ করার শক্তি।

হায় রে জীবন! কত যে স্মৃতি ছোটলু ভাইয়ের সরল, আন্তরিক সান্নিধ্যের। লিখতে গেলে সাতকাণ্ড রামায়ণ হয়ে যাবে। স্মৃতির দরিয়ায় বাঁও মেলে না যে।

ছোটলু ভাই, তুমি জীবন-নদীর ওপারে যেখানেই থাকো, ভালো থেকো—যেমন ছিলে এপারে ছিয়াত্তর বছরের বর্ণিল জীবনে—সংসার, কর্মক্ষেত্র, নাগরিক, বন্ধু ইত্যাদি নিয়ে।

n লেখক :নাট্যব্যক্তিত্ব