শুধু ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি নয়, বিদেশি বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানির নামে জাল কাগজপত্র তৈরিতেও সিদ্ধহস্ত পিটিএসএল মৈত্রী লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহাবুবুর রহমান। বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্যাড, সিল ও সংশ্লিষ্টদের স্বাক্ষর জাল করে তিনি বড় বিনিয়োগের টোপ দিয়ে ফাঁদে ফেলতেন দেশের বড় বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। তার পাতানো ফাঁদে পড়ে শুধু আর্থিক লোকসানের মুখেই পড়েননি অনেকে, জাল নথিপত্র সরকারি দপ্তরে দাখিল করার দায়ে মামলার মুখেও পড়তে হয়েছে। এমনকি বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগের আশায় মাহাবুবুর রহমানকে নিজ কোম্পানির পরিচালক বানিয়ে এবং কমিশনের অগ্রিম অর্থ দিয়েও সর্বস্বান্ত হয়েছেন কেউ কেউ।
মাহাবুবুর রহমানের প্রতারণার শিকার হয়ে বিপদে পড়া ভুক্তভোগীদের অনেকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন (এলজিআরডি) ও সমবায়, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগপত্রে তারা মাহাবুবুর রহমানসহ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সংসদীয় কমিটিরও হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। সংসদীয় কমিটিগুলো এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিচ্ছে।
তিস্তায় সেতু নির্মাণে ৪৫ কোটি টাকা ব্যাংক গ্যারান্টি জালিয়াতির অভিযোগে পিটিএসএল মৈত্রী লিমিটেডের এমডি মাহাবুবুর রহমান ও এলজিইডির সাবেক প্রকল্প পরিচালক খন্দকার মাহবুব হোসেনসহ তিন জনের বিরুদ্ধে ১৭ নভেম্বর মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ সংস্থার উপসহকারী পরিচালক শাহজাহান মিরাজ মামলাটি করেন। দুদকের এই মামলার সূত্র ধরে মাহাবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে আরো জাল-জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন কয়েক জন ভুক্তভোগী।
দুদকের মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, এলজিইডির অধীনে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় তিস্তা নদীর ওপর প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে অংশ নিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে যৌথভাবে ইনফ্রাটেক কনস্ট্রাকশন ও পিটিএসএল মৈত্রী লিমিটেড সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ পায়। কাজটি পেতে প্রতিষ্ঠান দুইটি সাড়ে ৬ কোটি টাকার ভুয়া টেন্ডার সিকিউরিটি এবং ৩৯ কোটি টাকার ভুয়া পারফরম্যান্স সিকিউরিটিও জমা দেয়। ইউনিয়ন ব্যাংকের পান্থপথ শাখার নামে এসব ভুয়া সিকিউরিটি নথি জমা দেওয়া হয়। পরে সেগুলো যাচাই করলে জমা দেওয়া সিকিউরিটির সব নথি জাল বলে ধরা পড়ে। সিকিউরিটি জালিয়াতির দায়ে প্রতিষ্ঠান দুইটির কার্যাদেশ বাতিল করে এলজিইডি।
তিনটি সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া অভিযোগে ভুক্তভোগীরা জানান, পিটিএসএল মৈত্রী লিমিটেডের এমডি মাহাবুবুর রহমানের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে তারা প্রতারণার শিকার হন। বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে ব্যবসার সুযোগ করে দেবেন বলে দেশের বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে প্রথমে চুক্তিবদ্ধ হন মাহাবুবুর রহমান। চুক্তিতে স্থানীয় কোম্পানির নির্ধারিত শেয়ারের মালিকানার পাশাপাশি যৌথ ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফার নির্ধারিত ভাগের আগাম অর্থও নিয়ে নিতেন তিনি। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, পরে দেখা যেত বিদেশি যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে এবং বিদেশি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির যে কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে সেগুলো ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া।
রেলপথ বিভাগে ব্যবসা করা একজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তাকে ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি ও বিদেশি একটি কোম্পানির ভুয়া নথিপত্র দেন মাহাবুবুর রহমান। সরল বিশ্বাসে সরকারি দপ্তরে ঐ সব কাগপত্র জমা দিয়ে পরে জানতে পারেন সবকিছু ছিল বানোয়াট। এ কারণে ঐ ব্যবসায়ী একবার রেলপথ বিভাগের সঙ্গে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে কালো তালিকাভুক্তও হয়েছিলেন। আরেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে ব্যবসা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে মাহাবুবুর রহমান তার প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হন এবং মুনাফা ধরে কয়েক শতাংশ হারে অগ্রিম টাকা নেন। কিন্তু পরে সরকারি অনুসন্ধানের ধরা পড়ে, দাখিলকৃত সব কাগজপত্র জালিয়াতি করা। বিদেশি যে কোম্পানির প্যাড ও কাগজপত্র দাখিল করা হয়েছে, পরে সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারা যায় যে, ঐ সব কাগজপত্র ভুয়া। এমনকি পরে উলটো মাহবুবুর রহমান মামলা করেছেন দেশি ঐ কোম্পানির বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, পিটিএসএল কোম্পানিটিও ছিল অন্য জনের। মাহাবুবুর রহমান জাল নথিপত্রের মাধ্যমে এবং নানা কৌশলে প্রতিষ্ঠানটি দখলে নিয়ে পিটিসিএল মৈত্রী নামে নিজে নতুন কোম্পানি খোলেন। ভুক্তভোগী একজনের অভিযোগ, বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশ নিতে তাকে প্রস্তাব দেন মাহাবুবুর রহমান। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী একটি দেশের নামকরা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জয়েন্টভেনচার করিয়ে দেবেন বলে টোপ দেন। মাহাবুবুর রহমানের প্রস্তাবে রাজি হন তিনি। মাহাবুবুর তাকে বিদেশি ঐ কোম্পানির সব কাগজপত্রও এনে দেন। পরবর্তীতে সেসব কাগজপত্র রেলওয়েতে জমা দেওয়া হয়। রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিদেশি ঐ কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, এই ধরনের কোনো দরপত্রে তাদের কোম্পানি অংশ নেয়নি, এমনকি দাখিলকৃত কাগজপত্রও ভুয়া বলে জানিয়ে দেয়। ভুক্তভোগী জানান, দেশে বসেই বিদেশি কোম্পানির নামে এভাবে নকল কাগজপত্র তৈরি করেন মাহাবুবুর রহমান। ঐ ঘটনায় রেলওয়েতে কালো তালিকাভুক্তও হয়েছিলেন ভুক্তভোগী ঐ ব্যবসায়ী।
মাহাবুবুর রহমান একবার রেলওয়েতে তিনটি দরপত্রে ওটিবিএলের নামে ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিয়ে ধরা পড়েন। এজন্য রেলওয়েতে পাঁচ বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্তও হয়েছিলেন তিনি। জানা গেছে, মাহাবুবুর রহমান প্রতারণার ফাঁদ পেতে ওটিবিএলের পরিচালক হয়েছিলেন। পরে তার প্রতারণা ধরা পড়লে বিপাকে পড়ে ওটিবিএল। মাহাবুবুর রহমানের প্রতারণার শিকার একটি প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ইত্তেফাককে জানান, মাহাবুবুর রহমানের প্রতারণা বহুমাত্রিক। ভদ্রবেশী মাহাবুবুর রহমান প্রতারণার বিশাল জাল তৈরি করে টার্গেটকৃত কোম্পানিতে ঢুকে প্রথমে পরিচালক হন, পরে তার প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক কোম্পানি পথে বসেছে।
