অণুগল্প

হাতকাটা মানুষের দেশ

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ২০:২৮

 

কুতুবউদ্দিনের চোখ আটকে যায় পেছন পেতে দাঁড়িয়ে থাকা এক শরীরে। ভিড়ের ফাঁকে শরীর সামান্যই বোঝা যাচ্ছে। সোনালি পাড়ের গোলাপি শাড়ি। উঁচু খোঁপা। খোঁপায় ফুল। শরীরটা কুতুবউদ্দিনের মাথায় হামলে পড়ে আর তখনই বাসটা হিক্কা তুলে ব্রেক কষে। পেছনের ধাক্কায় ভিড়ের চাকটা টলে উঠল। কুতুবউদ্দিন একটু বেশিই টলল। গোলাপি শাড়ির হালকা স্পর্শে কুতুবউদ্দিনের শরীর চনমনিয়ে ওঠে। ফসকে যাওয়া সম্ভাব্য সুখ তার রোখ বাড়িয়ে তুললে সে ফন্দি-ফিকির করতে লেগে যায়। চকিতে একবার পরিস্থিতি জরিপ করে নিল সে। শরীরটার গলা আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। গলা থাকলে তুলকালাম চিত্কার শুরু হবে। যদি হইচই বাধে; ধাক্কা সামলাইতে পারি নাই, তোমার মতো আমার একটা মেয়ে আছে ইত্যাদি ফেনিয়ে উপস্থিত যাত্রীবৃন্দের সমর্থন পাওয়া কোনো ব্যাপারই না। কোনো জোয়ান পোলা থাকলে অবশ্য বিপদ। চড়থাপ্পড় পড়তে পারে। আজকালকার তেড়িয়া মেয়েমানুষও কম বিপদের না। কুতুবউদ্দিন চারপাশে চিলচোখ চালায়। গেটের কাছে ছাত্র কিসিমের এক ছেলে ঝুলছে। তবে ভিড় ঠেলে এতদূরে তার আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবু সেন্টিমেন্টাল উপাদানগুলো একটু ঝালিয়ে নিল, বাপের বয়সী মানুষের গায়ে হাত তুলো? তোমার জ্বলে ক্যান; কিছু আছে নাকি মাইয়ার লগে? এ দুটো মসলা পাবলিক খুব ভালো খায়। কুতুবউদ্দিন অপেক্ষা করে আরেকটা ব্রেকের। কপালের ফের আর কাকে বলে!

আজ হিক্কা তোলা ব্রেকেও আকাল লেগেছে। মেজাজ খিঁচড়ানোর আগেই কন্ডাকটর ভাড়া তুলতে এলো। ঠেলেঠুলে সে ঢুকছে। আবার আকাঙ্ক্ষিত চাপ তৈরি হলো। সুযোগ বারবার আসে না। কুতুবউদ্দিন সামনে ঠেসে গিয়ে কন্ডাকটরকে জায়গা দেয় এবং হাত গলিয়ে দেয় গোলাপি শরীরের ডান বগলের তলা দিয়ে। শরীরখানা বেঁকে বেরিয়ে যায়। কুতুবউদ্দিন আর সুযোগ পায় না।

সন্ধ্যায় কুতুবউদ্দিন বাড়ি ফেরে। হালিমাকে জিজ্ঞেস করে, শিউলির পরথম দিনের কলেজ কেমুন হইলো?

উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে পা বাড়ায় শিউলির ঘরের দিকে। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। শাড়ি পরেছে। মেয়েকে অচেনা লাগে। এই প্রথম শাড়ি পরা দেখছে কি না!

সোনালি পাড়ের গোলাপি শাড়ি। কুতুবউদ্দিনের ঘোলাটে চোখ দেখে উঁচু খোঁপা, খোঁপায় ফুল। বাসভ্রমণের সুখ  মরণ গোঙানিতে রূপান্তরিত হওয়ার ঠিক আগে আগে তার মগজে এক অচেনা নরকের দরজা খুলে যায়। পরদিন ফজরের ওয়াক্তে হালিমা ঘুম ভেঙে বিছানার পাশটা খালি দেখে। এত ভোরে কই গেল মানুষটা!

আলো ফোটার পরও স্বামী ফিরল না বলে হালিমা দুশ্চিন্তায় পড়ে। অকস্মাত্ বাড়ির বাইরে হইচই শোনা যায়। রক্তধুলো মেখে রেললাইনে পড়ে আছে আঙুল গোটানো একজোড়া কালসিটে হাত। কিন্তু মানুষটা গেল কই? একজন বলে, দেখেন রক্ত! মানুষটা হাইটা গেছে এই পথে। চলেন দেখি অহনো বাইচা আছে কি না। অতঃপর অসংখ্য সম্ভাব্য কাটাহাত মানুষের মিছিল রক্তের দাগ ধরে এগুতে থাকে ভবিষ্যতের দিকে।