আমাদের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় বেশির ভাগ মানুষ ঘরের বাইরের খাবার খেয়ে থাকে। আমরা প্রতিদিন ঘরের বাইরে বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুডের দোকানে অথবা চায়নিজ রেস্তোরাঁয় যা খাচ্ছি তা কতখানি স্বাস্থ্যসম্মত খাবার—তা কখনো ভেবে দেখিনি। বাইরের খাবারের মধ্যে বিশেষ করে ফুটপাতে অথবা ভ্যানে করে যেসব খাবার বিক্রি করা হয়, সেগুলো মানবদেহের জন্য কতখানি স্বাস্থ্যসম্মত তা কেউ পরখ করে দেখেন না। ফুটপাতের এসব দোকানে যেসব খাবার পরিবেশন করা হয় তা মোটেই মানসম্মত নয়। অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে এসব খাবার তৈরি করা হয়। প্রায়ই দেখা যায় পচা-বাসি খাবার পরিবেশন করা হয়। পোড়া তেল দিয়ে নাস্তা তৈরি করা হয়। যা নাকি খেলে শরীরে নানা রোগের সৃষ্টি হয়। এসব হোটেলের গ্রাহক হলো নিম্ন আয়ের লোক। তারা এসব খাবার খেয়ে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে—এসব খাবারের দোকানে খোলা জায়গায় খাবার রাখা হয়। যেখানে মাছি সারাক্ষণ ভনভন করে। মাছির মাধ্যমেও বিভিন্ন রোগ ছড়ায়। এখানে দুই-তিন দিন আগের খাবারও বিক্রি করা হয়। এসব নিম্নমানের খাবার মানবদেহের কী যে ক্ষতি করছে তা অনুসন্ধান করলে ভয়ে আতঙ্কিত হতে হবে। এব্যাপারে বিশিষ্ট চিকিত্সক ডা. মামুনুর রহমান বলেন—বাইরের খাবারগুলোতে যেসব উপাদান থাকে তা খেলে গ্যাস্ট্রিক, আমাশয়, ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ জন্ডিসসহ বিভিন্ন রোগ হতে পারে। ডায়রিয়া হলে রোগীর কিডনি বিকল হয়ে রোগী মারা যেতে পারে। টাইফয়েড থেকে মানবদেহের অন্ত্রে রক্তক্ষরণ হয়। এতে রোগী মারা যেতে পারে। ডায়রিয়া, আমাশয় হয়ে শরীরের পানি এবং লবণ শূন্য হয়ে পড়ে। এতে রোগীর জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে। বাইরের খাবারের মধ্যে পিঁয়াজি, বেগুনি, শিঙাড়া, সমুচা, অনথন, ডালপুরি, চটপটি, বার্গার, পরোটা, ডাল, ভাজিসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার রয়েছে। বিশেষ করে বাইরে সাধারণ যেসব আইসক্রিম বিক্রি করা হয় সেগুলোতে যে পানি ব্যবহার করা হয় তা মোটেই বিশুদ্ধ নয়। এই আইসক্রিমের মাধ্যমেও বিভিন্ন ধরনের রোগ ছড়াতে পারে।
ফুটপাতের খাবার ছাড়াও সাধারণ মানের যেসব হোটেল-রেস্তোরাঁ রয়েছে সেগুলোর অবস্থা আরো ভয়াবহ। এসব হোটেল-রেস্তোরাঁয় কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। নোংরা, দুর্গন্ধময় পরিবেশে খাবার রান্না করা হয়। খাবারের মান একেবারে নিম্নমানের। এসব হোটেল-রেস্তোরাঁয় সাধারণ মানুষ খেয়ে নীরব ঘাতক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নিম্নমানের তেল ও বিভিন্ন খাবারের উপকরণ দিয়ে যেসব খাবার তৈরি করা হয় সেগুলো মোটেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। তাছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁয় যেসব কর্মচারী কাজ করে তাদের অধিকাংশই কোনো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে না। তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন রোগের ধারক, বাহক। ফুটপাত, সাধারণ হোটেলের বাইরে বিভিন্ন ফাস্টফুডের দোকানে যেসব খাবার পরিবেশন করা হয় সেগুলোর অধিকাংশই ক্রেতাদের ধোঁকা দিচ্ছে। এসব ফাস্টফুডের দোকানে বেশির ভাগ পচা-বাসি খাবার দিয়ে মজাদার খাবার তৈরি করে থাকে। সেগুলো খেলে অসুস্থ হওয়া স্বাভাবিক। তারপর আসা যাক চায়নিজ রেস্টুরেন্ট প্রসঙ্গে। এখানেও একই অবস্থা। ক্রেতাদের তারা কী খাওয়াচ্ছে তা ক্রেতারা কখনো পরখ করে দেখেন না। আমরা প্রায়ই দেখি ভ্রাম্যমাণ আদালত এসব হোটেল-রোস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে পচা-বাসি খাবার পরিবেশনের জন্য জেল-জরিমানা করে থাকে; কিন্তু তারপরও তারা দমে না। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে মরা মুরগির মাংস প্রায়ই পরিবেশন করে। খাসির মাংসের জায়গায় কুকুরের মাংস পরিবেশন করা হচ্ছে। বাজারের পচা-বাসি মাছ সবজি দিয়ে নিম্নমানের তেলের সাহায্যে বিভিন্ন খাবার তৈরি করা হয়। খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ধরনের ক্যামিকেল ও রং। যা নাকি মানবদেহের মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্ট্রিট ফুডের যথেষ্ট কদর রয়েছে। সেসব দেশের স্ট্রিট ফুড যথেষ্ট স্বাস্থ্যবিধি মেনে, খাঁটি খাবার পরিবেশন করে থাকে। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের বিভিন্ন স্থানের স্ট্রিট ফুডের যথেষ্ট কদর রয়েছে। সেখানে দেখা গেছে যে, খাবারের অর্ডার দিলে খাবার তৈরি করে দেবে। আগে থেকে কোনো খাবার তৈরি করে রাখা হয় না।
খাবারের উপকরণে কোনো ধরনের ভেজালসামগ্রী ব্যবহার করা হয় না। যে কারণে সেসব খাবার খেয়ে কোনো অসুখ হয় না। স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলোর ব্যাপারে প্রশাসন সবসময় সতর্ক থাকে। খাবারের দোকানের পরিবেশ এবং দোকানের কর্মচারীদেরকে স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলতে হয়। আমাদের দেশে সেই অবস্থা নেই। যে কারণে আমাদের দেশের মানুষ বাইরের খাবার খেয়ে প্রায়ই অসুস্থ হচ্ছে এবং জঠিল-কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে হয়। দেশের সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বলব— করোনাকালে বাইরের খাবারের প্রতি মনোযোগ কম দেবেন। আপনারা যতটুকু পারেন বাইরের খাবার পরিহার করুন। আর যদিও-বা হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেতে মন চায় তাহলে আমাদের দেশে সে সমস্ত মানসম্মত হোটেল-রেস্তোরাঁ রয়েছে সেগুলোতে যেয়ে মজাদার খাবার উপভোগ করুন। যেখানে সবকিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হয় সেখানেই যাবেন। সুস্থ থাকুন। বেশি দিন বাঁচুন—এই মনোভাব নিয়ে চলবেন, দেখবেন সবই ঠিক আছে।
n লেখক :বিমা কর্মকর্তা
