যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর সাজা

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:২১

যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড। তবে কোনো মামলায় আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়ার এক্তিয়ার দেশের আদালত বা ট্রাইব্যুনালের রয়েছে। আর সেই এক্তিয়ার প্রয়োগের ফলে কোনো আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলে স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত তাকে কারাগারেই বাকি জীবন কাটাতে হবে। তিনি কোনো ধরনের রেয়াত সুবিধা পাবেন না মর্মে রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে গতকাল মঙ্গলবার এ রায় ঘোষণা করেন। এ রায়ের ফলে যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ নিয়ে গত তিন বছর ধরে চলে আসা বিভ্রান্তির অবসান হলো বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ রায় যুগান্তকারী। এই রায়ের মধ্য দিয়ে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে নতুন মাত্রা যুক্ত হলো।

জানা গেছে, সাভারে জামান নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে ২০০৩ সালে নিম্ন আদালত আসামি আতাউর মৃধা ও আনোয়ারকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট ঐ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড          বহাল রাখে। এ রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল করেন। ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দুই আসামিকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বলা হয়, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড। স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে কারাগারে থাকতে হবে। আপিলের ঐ রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ পিটিশন করেন আতাউর ও আনোয়ার। ঐ রিভিউ পিটিশনের শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য রাখা হয়।

রায়ে যা বলা হয়েছে :গতকাল সকালে আপিল বিভাগের কার্যক্রম শুরুর পর প্রধান বিচারপতি রিভিউ পিটিশনের ওপর রায় ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতের ভিত্তিতে এ রায় দেওয়া হলো। রায়ে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে হচ্ছে দণ্ডিত ব্যক্তির স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কারাবাস। তবে দণ্ডবিধির ধারা ৪৫ (জীবন) ও ৫৩ (দণ্ডসমূহ) যদি একই আইনের ৫৫ (যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হ্রাস) ও ৫৭ (দণ্ডের মেয়াদসমূহের ভগ্নাংশ) ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ৩৫(ক)-এর সঙ্গে একত্রে মিলিয়ে পড়া হয় তাহলে বোঝা যায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে হচ্ছে ৩০ বছর। এছাড়া আদালত, ট্রাইব্যুনাল অথবা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল যখন কোনো আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়, তখন দণ্ডিত ব্যক্তি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫ (ক) ধারার সুবিধা  (রেয়াত) পাবেন না। প্রধান বিচারপতি ছাড়াও বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন—বিচারপতি মুহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার, বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান, বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।

আইন বিশেষজ্ঞদের মত :রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, যাবজ্জীবন বলতে বিভিন্ন আইন, ধারা-উপধারা বিশ্লেষণ করে আদালত বলছে যে, এটা (যাবজ্জীবন) ৩০ বছর। কিন্তু যদি কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কোনো মামলায় কাউকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়, সেক্ষেত্রে ৩০ বছর নয়, আমৃত্যু হবে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রায়ে আমরা মোটামুটি সন্তুষ্ট। তবে আমৃত্যু সাজাটা যদি থাকে, তাহলে জেলখানায় ওল্ডহোম করতে হবে। একজন মানুষ যখন অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে যাবে, তখন তার চলাফেরার শক্তি থাকবে না। তখন তার সেবা-শুশ্রূষার বিষয়টিও আদালতকে বিবেচনা করতে হবে।

আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টসের (ডিএলআর) সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প হিসেবে হয়তো আদালত আমৃত্যু কারাবাসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে এ বিষয়ে জানা যাবে।’

এদিকে রিভিউ পিটিশনকারী আতাউর ও আনোয়ারের সাজা সম্পর্কে আপিল বিভাগের আদেশে কিছু বলা হয়নি। তাদের আইনজীবী শিশির মো. মনির জানান, পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে দুই আসামিকে আমৃত্যু, না ৩০ বছর সাজা ভোগ করতে হবে—সে সম্পর্কে জানা যাবে।