শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বহু বত্সর ধরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার দাবি জানাইয়া আসিতেছেন। এই দাবির যৌক্তিকতা সরকার উপলব্ধি করিয়া প্রায় এক দশক ধরিয়া এই পদ্ধতি কার্যকর করিবার চেষ্টা চালাইয়া আসিতেছে; কিন্তু কয়েকটি প্রথম সারির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্মত না হওয়ায় তাহা বাস্তবায়ন করা যায় নাই। এই ব্যাপারে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট বা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আচার্য আবদুল হামিদ উপাচার্যদের সহিত বৈঠকে ইহার গুরুত্ব তুলিয়া ধরিয়া বক্তব্য দিয়াছেন। অবশেষে এই ব্যাপারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক মনোভাব পরিলক্ষিত হইতেছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে তিনটি গুচ্ছে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হইয়াছিল। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের মতবিনিময় সভায় এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইয়াছে। সেই অনুযায়ী দেশের ১৯টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২০-২০২১ শিক্ষাবত্সরে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হইবে। মানবিক, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান—এই তিনটি বিষয়বস্তুর উপর উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে হইবে এই পরীক্ষা। অবশেষে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি কার্যকর হওয়ায় আমরা সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানাই এবং ইহার সফল বাস্তবায়ন কামনা করি। আশা করি, ইহাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বহুদিনের দুর্ভোগ, বিড়ম্বনা ও দুশ্চিন্তার অবসান হইবে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা যখন কম ছিল, তখন এই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথকভাবে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য তেমন কঠিন ছিল না; কিন্তু নব্বইয়ের দশকে শিক্ষাক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হইবার পর আমাদের দেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং ইহার সহিত পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বাড়িতে থাকে। এই সময় লেখাপড়া আরো প্রতিযোগিতাময় হইয়া উঠে। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে কমন বা সাধারণ ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চালু না থাকায় উপরন্তু দেশের এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্তে দৌড়ঝাঁপ করিতে গিয়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কষ্ট বৃদ্ধি পাইতে থাকে। বিশেষ করিয়া নূতন জায়গায় ও নূতন পরিবেশে ছাত্রীদের ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া কঠিন হইয়া পড়ে। তবে সকল মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা একযোগে, একই সময়ে ও একই পদ্ধতিতে হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হইবার পর সকলের মনে প্রশ্ন জাগে—মেডিক্যাল কলেজসমূহে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা হইতে পারিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে হইতে পারিবে না কেন? সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি একই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ একত্রে বসিয়া গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করিলে দেশের মানুষের অনেক উপকার হয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শ্রম, অর্থ ও সময়ের অপচয় হয় না। গত বত্সর প্রথমবারের মতো কৃষিবিষয়ক ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হইয়াছে। এই বত্সর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নেতৃত্বে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ কেন্দ্রীয়ভাবে ও গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করিবে বলিয়া আশা করা হইতেছে। এইভাবে এই পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বাড়িতেছে। যে কোনো নূতন পদ্ধতি, যাহা জনকল্যাণমূলক, তাহা গ্রহণে আমাদের সমস্যা কোথায়? যে চারটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় এখনো এই ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নাই, তাহাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হইবে বলিয়া আমরা আশা করি। ইহার সহিত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব হইবার কোনো আশঙ্কা নাই।
জাতীয়, উন্মুক্ত ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় জিপিএর ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করিতেছে। অর্থাত্ তাহারা নূতন করিয়া কোনো পরীক্ষা গ্রহণ করিতেছেন না। ইহাও একটি ভালো পদ্ধতি। তবে ভর্তি পরীক্ষা লইতে হইলে সমমনা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের একই পদ্ধতি এবং একই সময়ে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়। যে ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয় এইবার গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কার্যকর করিতে যাইতেছে, আমরা তাহাদের অভিনন্দন জানাই।
