নানা নাটকীয় আর উত্তেজনায় শেষ হলো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন জয়ী হলে ট্রাম্প আদৌ ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন কি না—তা নিয়ে সংশয় ছিল। তবে বর্তমানে এসব প্রশ্ন শেষ। রিপাবলিক শিবির এবং স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প পরাজয় মেনে নিয়েছেন। বিশ্বের এখন নজর কেমন হতে যাচ্ছে জো বাইডেনের ক্যাবিনেট।
মন্ত্রিপরিষদে একদল ঝানু ও দক্ষ রাজনীতিককে ঠাঁই দিয়ে চমক দেখাতে চান নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে এক জন নারীকে বেছে নেওয়ার পর জো বাইডেন অর্থমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন আরেক নারী জ্যানেট ইয়েলেনকে। এছাড়া তার প্রেস ইউনিটের মনোনয়ন পাওয়া সবাই নারী। বাইডেনের পররাষ্ট্র ও নিজ রাষ্ট্রনীতি বারাক ওবামার নীতি দ্বারা প্রভাবিত হবে। বাইডেন ওবামার স্বাস্থ্যনীতি ওবামা কেয়ার, জলবায়ু ও ইরান ইস্যুতে ওবামার সিদ্ধান্তে ফিরে যাবেন। এটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যখন বাইডেন আমলে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাওয়া সবাই কোনো না কোনোভাবে ওবামার প্রশাসনে যুক্ত ছিলেন। তার মন্ত্রপরিষদে অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্টনি ব্লিনকেন নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। ওবামা প্রশাসনের আমলে উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপ-উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন হার্ভার্ড ও কলম্বিয়া ল’ স্কুলে পড়াশোনা করা ব্লিনকেন। হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন জ্যাক সুলিভান। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি ছিলেন জো বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা। অ্যান্টনি ব্লিনকেন ও জ্যাক সুলিভান দুই জনই ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি নিয়ে ছয় জাতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। রাজনৈতিক কৌশলবিদ রন ক্লেইনকে হোয়াইট হাউজে চিফ অব স্টাফ হিসেবে বেছে নিয়েছেন জো বাইডেন। বারাক ওবামার প্রশাসনে তিনি উপদেষ্টা ছিলেন।
জো বাইডেন প্রশাসনে জলবায়ুবিষয়ক দূতের পদ পেতে যাচ্ছেন ওবামার আমলের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। ২০১৬ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তিনিই স্বাক্ষর করেছিলেন। বাইডেন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন দীর্ঘদিনের কূটনীতিক লিন্ডা থমাস-গ্রিনফিল্ড। তিনিও সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অধীনে কাজ করেছেন। এর মধ্যে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি আফ্রিকা-বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সেক্রেটারি হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন প্রথম ল্যাতিনো হিসেবে অ্যালেজান্দো মায়োরকাস। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনে তিনি ছিলেন হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ডেপুটি সেক্রেটারি। এছাড়া সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে জাতিসংঘের বিশেষ দূত নিয়োগ করে বাইডেন প্রশাসনের অংশ করার কথাও শোনা যাচ্ছে। এভাবে পুরোনো কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগের ফলে তরুণ ডেমোক্র্যাট নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
তবে নির্বাচনে হেরে গেলেও ভোটের পর বা ক্ষমতা ছাড়ার পর যে ব্যতিক্রমী প্রভাব তৈরি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প তার রেশ থেকে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে। এমনও হতে পারে যে, তিনি তৃতীয় দফায় ২০২৪ সালে আবার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করতে পারেন। এবারের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে জো বাইডেন প্রতিদ্বন্দ্বী করলেও নির্বাচনের মাঠে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমভাবে ছিলেন বারাক ওবামা, হিলারি ক্লিনটনও। বাইডেন মার্কিন প্রশাসনে ওবামানীতি ফিরিয়ে আনলে তার বিপরীতে ট্রাম্প শিবির ২০২৪ সালে ট্রাম্পনীতি ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি শুরু করতে পারে। এছাড়া ২০২৪ সালের জন্য ডেমোক্র্যাট শিবির থেকে বাইডেন বাকমলা হ্যারিস প্রার্থী হওয়া নিয়ে নানা সংশয় আছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নানা দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা রয়েছে। ক্ষমতা ছাড়ার পর এসব মামলা পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ধরনের আচরণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে করলেন সেক্ষেত্রে তিনি CLEAN ESCAPE ROUT নাও পেতে পারেন। প্রেসিডেন্ট অফিস ছাড়ার পর জাতীয় নিরাপত্তার অনেক বিষয় প্রেসিডেন্টকে অবহিত করার রেওয়াজ আছে। ট্রাম্প কোনোভাবে মামলার ঝামেলায় পড়লে এসব তথ্যকে তার বাঁচার হাতিয়ার করতে পারেন। ফলে টেকসই গণতন্ত্রের দেশ মার্কিন চিরাচরিত নির্বাচনি সংস্কৃতি যে ধাক্কা খেয়েছে এবং তার রেশ বহুদূর গড়াবে বলে আশঙ্কা থাকছে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
