পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২৩ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে গতকাল তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও বরিশালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি দিবস উদ্যাপিত হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের উদ্যোগে জনসভার আয়োজন করা হয়। রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির আয়োজনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বান্দরবানে জেলা পরিষদ চত্বরে বেলুন উড়িয়েম ও কেক কেটে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এছাড়া বরিশালে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে পার্বত্য শান্তিচুক্তি দিবস উদ্যাপিত হয়েছে। প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।
দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) সংবাদদাতা জানান, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা সদরের কল্পরঞ্জন মাঠে ‘ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক)’-এর উদ্যোগে জনসভায় বক্তারা বলেছেন, সরকার স্বাক্ষরিত চুক্তির অনিষ্পন্ন বিষয়াদি ঝুলিয়ে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণের প্রতি রাজনৈতিক অবমূল্যায়ন করছে। এর মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস-অসন্তোষ দানা বাঁধছে। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি শ্যামল কান্তি চাকমা তরু। জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) কেন্দ্রীয় শরণার্থীবিষয়ক সম্পাদক প্রফুল্ল কুমার চাকমা। এতে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল-চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জনার্দন দে, জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক প্রীতিময় চাকমা এবং চট্টগ্রামের মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট মো. আব্দুর রহিম।
গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সদস্য অমর চাকমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় আরো বক্তব্য রাখেন দীঘিনালা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ধর্মবীর চাকমা, কবাখালী ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান বিশ্বকল্যাণ চাকমা, গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক জনপ্রিয় চাকমা, শরণার্থী নেতা ও লেখক আনন্দ মোহন চাকমা, দীঘিনালা কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হেমব্রত কার্বারি, গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় নেতা মিটন চাকমা এবং পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি দীপন চাকমা।
এদিকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে সকাল সাড়ে ১০টায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট হলে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদনের মাধ্যমে দিনব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন শরণার্থী পুনর্বাসনবিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। পার্বত্য চুক্তি দেশে ও বিশ্বে প্রসংশিত হয়েছে।
এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা) পৃথক কর্মসূচি পালন করে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সুভাষ কান্তি চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্য ও রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে বক্তব্য রাখেন ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক। আলোচানাসভায় বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন দ্রুত কার্যকর করা এবং পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানান।
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি আয়োজিত আলোচনাসভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ২৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে সরকার পার্বত্য চুক্তিকে বস্তাবন্দি করে রেখেছে। সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য সৌখিন চাকমার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন রাঙ্গামাটি আদিবাসী ফোরামের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অ্যাডভোকেট সুস্মিতা চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতির সহসাংগঠনিক সম্পাদক সাগর ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জগদিশ চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ম্রানু মারমা প্রমুখ।
বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, বান্দরবান জেলা পরিষদ চত্বরে বেলুন উড়িয়ে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ক্যশৈহা। পরে জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে কেক কাটা হয়। এ সময় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক লুত্ফর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আছাদ, সিভিল সার্জন ডা. অংসুই প্রু, পরিষদের সদস্য ক্যসাপ্রু মারমা, প্রেসক্লাব সভাপতি মনিরুল ইসলাম মনু প্রমুখ।
অন্যদিকে বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে ফ্রি চিকিত্সা ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। চিকিত্সা ক্যাম্পের উদ্বোধন করেন সেনাবাহিনীর ৬৯ রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খন্দকার মো. শাহীদুল ইমরান। শান্তিচুক্তির বিতর্কিত ধারাসমূহ সংশোধনের দাবিতে বান্দরবানে সংবাদ সম্মেলন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ। তবে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না করায় প্রতিবাদে জনসংহতি সমিতিসহ পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কোনো কর্মসূচি পালন করেনি।
বরিশাল অফিস জানায়, নানা আয়োজনে বরিশালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি দিবস উদ্যাপিত হয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়সংলগ্ন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে দিবসের কার্যক্রম শুরু হয়। জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন শেষে বেলুন উড়িয়ে ও শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন বিসিসির মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুচ, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম জাহাঙ্গীরসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিকালে নগরীর সোহেল চত্বরে দিবসটি নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
