বয়স যখন ঠিক ১১ মাস, ছোট্ট জাহিদুলকে নিয়ে পোলিওর টিকা দিয়ে বাসায় ফিরে বাবা-মা দেখেন ডান পা অবশ! পোলিওতে আক্রান্ত মো. জাহিদুল ইসলাম এর এই সমস্যার কোনো প্রতিকার তখনও নেই! বরগুনার ১০নং নলটোনা ইউনিয়নের শিয়ালিয়া গ্রামের এই ছেলের জীবনটা যেন এক বিস্ময়কর গল্প!
দাদির ঐকান্তিক ইচ্ছায় প্রথম স্কুলে গেলেও বাসাতেই দাদী পড়িয়েছেন সব, তালপাতায় লেখা, বাঁশ বেধে হাঁটানোর অভ্যাসসহ সব চেষ্টা করার পর স্কুলে ভর্তি হতে পারলেন প্রথমেই ২য় শ্রেণিতে। এরপর কখনো দাদীর সাথে, কখনো একলাই যেতেন স্কুলে। আশেপাশে প্রচুর টিটকারি মানুষের, এই ছেলেকে পড়িয়ে কি হবে। থাকুকনা যেমন যতদিন বাঁচে!
দাদী মানতে নারাজ সব অলক্ষুণে কথা! জাহিদুলকে মাধ্যমিক পড়িয়ে ভর্তি করলেন বরগুনা সরকারী কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে! এরপর গল্পটা অনেক দারুণ, জাহিদুল জানালেন, "কখনোই ভেঙ্গে পড়িনি যে আমার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আছে, বরং আমি অন্য বন্ধুদের সাথে পুরো এলাকা ঘুরে বেড়াতাম।" এরপর গল্পটা আরেকজন মানুষের সাথেও জড়িত, ফুপু( বাবার বোন) কথা কথা বললেন জাহিদুল। বরিশাল বিএম কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করলেন ২০১২ তে, পুরো যাত্রায় ফুপুর আন্তরিকতা অন্যরকম।
'অনেক খরচ সামলেছেন ফুপুই যদিও আমি পার্টটাইম সাইবার ক্যাফেতে কাজ করতাম। কম্পিউটারের কাজ শেখা ৮ম শ্রেণিতে পড়াকালীন মেজো-কাকার কম্পিউটার দোকানে, আমারো ধারনা ছিলো ডেক্সজব যেহেতু আমাকে করতে হবে তাই ভালো টাইপিং স্পিডে কাজও শিখেছি', বলছিলেন জাহিদুল।

পড়াশোনা শেষে জাহিদুল অনেক স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় আসলেন। নিউ গ্রুপে ফ্রন্ট ডেস্কে একটা চাকরীও পান! এরপর আর থামেনি তার জয়যাত্রা, পাঠাওসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অপারেশনস বিভাগে কাজ করে একটি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে কি একাউন্ট ম্যানেজার হিসেবে সাড়ে তিনবছর কাজ করেন! এরপর সেলসে জয়েন করেন আরেকটি নামকরা কুরিয়ারে, এরপর একটা প্রতিষ্ঠানে সেলস লিড হিসেবেই কাজ করলেন যেটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে সমসাময়িক সময়ে। কোভিডে বাসায় বসা, কি করবেন না করবেন ভাবতে ভাবতেই এক ফেসবুক নক!
স্বয়ং ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ রাসেল তাকে অফার করলেন ইভ্যালির কুরিয়ার অপারেশনস টিমে কাজ করার এবং খুব স্পষ্টভাবে! জাহিদুল এতবড় একজন মানুষকে না করতে পারেননি। জানালেন, যুক্ত হয়ে স্বপ্ন বিনির্মাণে সঙ্গী হবেন! জাহিদুল কোভিড-১৯ এর দুর্যোগে এপ্রিল ২০২০-এ যোগ দিলেন ইভ্যালির ই-ফুড এবং ই-লজিস্টিকস বিভাগে। বর্তমানে ৩৭ জন কাজ করেন তার টিমে, ৩৬০০ এর বেশী ডেলিভারি সাপোর্ট স্টাফ তার টিমে। আটটি ভিন্ন জেলায় ইভ্যালির পুরো ডেলিভারি দেখছেন তিনি! অবাক করা গল্পের মহানায়ক জাহিদুল বেশ তৃপ্ত তার পথচলায়।

ইভ্যালি সিইও মোহাম্মাদ রাসেল বলেন, 'আমি অনেক গর্বিত যে জাহিদুল আমাদের টিমে কাজ করছে, কখনো ওর শারীরিক সমস্যা আমাদের কাজে বাঁধা হয়নি। ইভ্যালি সবসময়ই মেধাবীদের জায়গা। নিকট ভবিষ্যতে আরো বেশী এরকম তরুণদের সাথে কাজ করতে চাই আমরা।
আজ বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস। আজ গল্পটা যদি কেউ পরে থাকেন, প্লিজ নিজেকে বোঝা মনে না করে কাজে নামুন, আমি যেহেতু একটি ই-কমার্সে কাজ করতে পারছি, আপনারাও পারবেন জীবনে অনেক কিছু করতে।'
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
