বর্তমানে গণতন্ত্রকে বলা হইয়া থাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকাইতে পারি। দেশটিকে বলা হয় গণতন্ত্রের স্বর্গরাজ্য। মুক্তমত ও স্বাধীনভাবে বসবাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তুলনা হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতিতেও সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের প্রসারের দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বের সহিত দেখা হয়। কিন্তু আমেরিকার গণতন্ত্রের বাঘের ঘরেও যে ঘোগ বাস করিতে পারে, তাহা ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় না আসিলে সম্ভবত এত স্পষ্ট করিয়া বুঝা যাইত না।
ইহা ঠিক যে, সকলেই চাহেন ক্ষমতায় টিকিয়া থাকিতে। কিন্তু সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে ক্ষমতায় টিকিয়া থাকিবার লড়াইতে যখন একগুঁয়েমি ও জোরজবরদস্তি দেখা যায়, তখন বিস্ময় জাগে বটে। অন্তত দেশটির নাম যখন আমেরিকা হয়। সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরের দিনই ডোনাল্ড ট্রাম্প একরকম গায়ের জোরেই বলিয়াছেন—আমরা না জিতিলেই বুঝা যাইবে, ভোটে কারচুপি হইয়াছে। ইহার পর ট্রাম্প যখন নির্বাচনে হারিয়াছেন তখন বিশ্বের অন্যান্য ডিকটেটরদের মতো তিনিও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করিয়াছেন। ভোটের লড়াইয়ে পরাজয়ের পরও ক্ষমতায় থাকিয়া যাইবার ব্যাপারে নিজের সমর্থক ও পারিষদদের বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করিয়াছেন। যদিও নির্বাচনের প্রায় তিন সপ্তাহ পর ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করিতে রাজি হন ট্রাম্প। তবে ইহাও বলিয়াছেন যে, তিনি তাহার জয়ের দাবি ছাড়েন নাই এবং তিনি লড়িবেন। দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রবন্ধে বলা হয়—নির্বাচনের ২০ দিন পর পর্যন্ত ক্ষমতা কামড়াইয়া থাকিবার বাসনা মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। ঐ প্রবন্ধে বলা হইয়াছে—মার্কিন গণতন্ত্রে ঘুণ ধরাইয়া দিয়া গেলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটির বিচার বিভাগের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের একজন সাবেক কর্মকর্তা বলিয়াছেন যে, তিনি অন্যদের মতো বহুকাল ধরিয়া মনে করিতেন আমেরিকায় গণতন্ত্রের সুরক্ষা দেওয়ালগুলি কাজ করিয়া থাকে। কিন্তু সর্বশেষ কয়েক সপ্তাহে তাহার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাইয়া গিয়াছে। এখন প্রশ্ন হইল—যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও যদি গণতন্ত্রের মধ্যে ঘুণপোকা ধরিতে পারে, তবে তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের গণতন্ত্রের অবস্থা কীরূপ হইতে পারে?
গণতন্ত্রে ভোট ও সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই বিগত বেশ কয়েক দশকের নির্বাচনের নিরিখে বিশ্লেষকরা দেখিয়াছেন বিচিত্র সকল গলদ। এমনকি কোনো কোনো বড় গণতন্ত্রের দেশেও ভোটের দিন বুথ-জ্যাম, জাল ভোট, রিগিং, ছাপ্পা ভোট, বোমাবাজি, গোলাগুলি, প্রশাসনিক পক্ষপাত, রক্তপাত, লাশ এবং প্রয়োজনে নির্বাচন-পরবর্তী ঘোড়া কেনাবেচা হইয়া থাকে। এই সকল কিছুই কিন্তু ঘটিয়াছে কথিত গণতন্ত্রের মধ্যেই। এই জন্য অনেকে বলিয়া থাকেন—গণতন্ত্রকে বুঝিতে হইবে ইহার ব্যাবহারিক রূপ দেখিয়া। অনেকের নিকট গণতন্ত্র হইল স্টেট অব মাইন্ড। যদিও অ্যারিস্টটল, কার্লাইল, হেনরি মেইন মনে করিতেন, গণতন্ত্র হইল অশিক্ষিতদের শাসন। কার্লাইল তো স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন—গণতন্ত্র হইল মূর্খদের দ্বারা, মূর্খদের জন্য, মূর্খদের শাসন। অনেক দেশে পরিপূর্ণ বেসামরিক সরকার থাকিলেও সেইখানে গণতন্ত্র কতটা কার্যকরী—তাহা বুঝিতে বিশেষজ্ঞরা কিছু আলামতের কথা বলিয়া থাকে। উপসর্গ দেখিয়া যেমন রোগ বুঝা যায়, তেমনি গণতন্ত্রের রোগাক্রান্ত হইবার বিষয়টি বুঝা যায় কতিপয় উপসর্গের মাধ্যমে। ইহার মধ্যে রহিয়াছে—প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, জনগণকে নিয়ন্ত্রণ, ভোটার অংশগ্রহণে অনাগ্রহ, মতপ্রকাশে ভয় পাওয়া, ক্ষমতা হারানোর ভয় প্রভৃতি।
তবে শত প্রশ্নের মুখেও যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র এখনো উজ্জ্বল নিঃসন্দেহে। আমরা দেখিয়াছি, ট্রাম্পের অগণতান্ত্রিক আচরণের সামনে বড় বাধা ছিল আমেরিকারই গণতান্ত্রিক সংবিধান এবং এতদিনকার মূল্যবোধ। মার্কিন প্রেসিডেন্টের যতই এক্সিকিউটিভ পাওয়ার থাকুক, সেইখানে সমানভাবে শক্তিশালী সিনেট, কংগ্রেস ও বিচার বিভাগ। এই কারণে ট্রাম্পের যথেচ্ছচারকে ঠিকই লাগাম পরানো সম্ভব হইয়াছে। অতএব ইহা স্পষ্ট যে—‘গণতান্ত্রিক’ চর্চা বাধাপ্রাপ্ত তাহা কেবল ‘লেবাস’-এ পরিণত হয়।
