সৃজনশীল শেখ ফজলুল হক মনি

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৪৩

৪ ডিসেম্বর (২০২০) বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং অনন্য গুণাবলিসম্পন্ন যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনির জন্মদিন। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি ও স্বাধিকার আন্দোলনের নক্ষত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের সৃজনশীল যুবনেতা এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স তথা মুজিববাহিনীর অন্যতম প্রধান কমান্ডার শেখ ফজলুল হক মনি ১৯৩৯ সালের ৪ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়ায় ঐতিহাসিক শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম শেখ নূরুল হক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি। মা শেখ আছিয়া বেগম বঙ্গবন্ধুর বড়ো বোন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারসহ আরো যাদের হত্যা করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে শেখ ফজলুল হক মনি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিও ছিলেন। তখন শেখ ফজলে শামস পরশের বয়স ছিল ছয় বছর এবং তার ছোট ভাই শেখ ফজলে নূর তাপসের বয়স ছিল চার বছর।

ড. ওয়াজেদ তার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বৈঠকখানার বাইরে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম। এর পরেও তাঁরা যাচ্ছেন না লক্ষ্য করে আমি স্থির করলাম যে, রাতে খাবারের পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করবো। ঐ সময় বঙ্গবন্ধু দুই নেতাকে নিয়ে কিছু সময়ের জন্য বাসার বাইরে যান। রাত ১০টার দিকে বাসায় ফেরেন। এগারোটার দিকে হাসিনা ও আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে খেতে বসি। সে সময় বঙ্গবন্ধু কারো সাথে কোনো কথা না বলে খাবার শেষ করে অতিদ্রুত তাঁর শয়নকক্ষে চলে যান। ঠিক সেই মুহূর্তে শেখ ফজলুল হক মনি বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষে ঢুকেই ছিটকিনি লাগিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষের দরজা ছিটকিনি লাগিয়ে বন্ধ করে, বিশেষ করে আমার শাশুড়িকে শয়নকক্ষের বাইরে রেখে শেখ মনিকে ইতিপূর্বে কখনো তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) সাথে আলাপ করতে দেখিনি। রাত প্রায় পৌনে একটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। কিন্তু ততক্ষণেও শেখ মনির বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ শেষ হলো না। অতঃপর আমরা বাসায় চলে যাই রাত ১টার দিকে।’ (পৃ. ২১৫)। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে এই ছোট্ট ঘটনাটাই কি প্রমাণ করে না, শেখ মনিকে তিনি কতটা বিশ্বাস ও গুরুত্ব দিতেন?

১৪ আগস্ট ১৯৭৫ ছিল বৃহস্পতিবার। নতুন ব্যবস্থায় দেশের প্রতি মহকুমাকে জেলা ঘোষণা করে ৬৪ জেলায় একজন করে বাকশালের সম্পাদক এবং একজন করে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিল। বেইলি রোডের একটি বাড়িতে ৬৪ জেলার সম্পাদকদের প্রশিক্ষণের শেষ দিন ছিল ১৪ আগস্ট। ঐ দিন মূল বক্তা ছিলেন শেখ মনি। বাকশালের নীতি-আদর্শ ও ভবিষ্যত্ কর্মপন্থা নিয়ে মনি ভাই প্রায় দেড় ঘণ্টার এক অনবদ্য ও জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দেন। বক্তৃতা শেষে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফরহাদ মন্তব্য করেন, ‘আমার জানামতে এমন চমত্কার বক্তৃতা আর শুনিনি।’ ঐ রাতে বক্তৃতার পর সৈয়দ আহমদ একজন যুবককে যুবলীগ নেতা ফকীর রাজ্জাকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে বলেন, এ ছেলেটি আমার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছে এবং এখন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করে। আগন্তুক ছেলেটি একান্তে গিয়ে সৈয়দ আহমদ, ফকীর রাজ্জাক প্রমুখকে জানায়, চাকরি সূত্রে সে সেনা সদর এলাকায় দায়িত্ব পালন করে। ছেলেটি বলল, ‘পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশে যে কোনো সময় বড় ধরনের খারাপ কিছু ঘটে যাবে। এমনকি আজ রাতেই সরকারের  পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। সাবেক ও সদ্য চাকরিচ্যুত এবং চাকরিরত বেশ কিছু সেনা কর্মকর্তা সেনানিবাসে গোপনে শলাপরামর্শ করছে। ওদের হাবভাব ভালো নয়। কানাঘুষা চলছে—দেশে বড় একটা কিছু হয়ে যাবে।’ বক্তৃতা শেষে শেখ মনি তার গাড়ির কাছে গেলে সৈয়দ আহমদ, সুলতান শরীফ, শফিকুল আজিজ মুকুল, ফকীর রাজ্জাক বললেন, জরুরি কথা আছে। শেখ মনি তাদের গাড়িতে উঠতে বলেন। মনি ভাইয়ের গাড়িতে উঠলেন সৈয়দ আহমদ। অন্যরা সুলতান শরীফের গাড়িতে ওঠেন। রাত সাড়ে ৯টায় তারা গেলেন ৩২ নম্বরে, বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে এসে মনি ভাই জানান, ‘মামাকে সবকিছু জানিয়েছি, তিনি এখনই খোঁজ নেবেন।’ তারা চলে এলেন মনি ভাইয়ের ধানমন্ডির ১৩ নম্বর সড়কের ভাড়া বাড়িতে। অনেকক্ষণ পরে বাসায় আগত নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে গেঞ্জি গায়ে মনি ভাই নিচে এসে সহকর্মীদের বললেন, ‘চিন্তা কোরো না, বাসায় যাও।’ তাদের মধ্যে একজন বললেন, ‘আজকের রাতটা বাসার বাইরে থাকলে হয় না?’ এ কথায় পাত্তা না দিয়ে তাদের বিদায় করে নিজে গেট লাগিয়ে দেন। এটাই তাদের শেষ দেখা ও শেষ কথা। তখন রাত ১২টা পার হয়ে গেছে। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই ঘটে ইতিহাসের সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড।

হামলা মামলার সরকারি পক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেছেন, ‘মনি ভাই ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন লেখক, দক্ষ সাংবাদিক ও সম্পাদক, কর্মীবান্ধব নেতা, দূরদর্শী, অন্যায়ের প্রতিবাদী এবং প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার মানুষ। সংগঠক হিসেবে তার কোনো তুলনা হয় না। অনন্যসাধারণ সাংগঠনিক যোগ্যতার জন্যই স্বাধীনতার পর মনি ভাইকে বঙ্গবন্ধু যুবলীগ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেন।’

ফকীর আবদুর রাজ্জাক তার গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সে সময়কার রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সাথে সরাসরি জড়িত থেকে মনে হয়েছে, বাকশাল গঠনে শেখ মনির সম্পৃক্ততা ছিল বেশ গভীর। তিনি স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন চেয়েছিলেন। বাইরে থেকে দেখলে মনি ভাইকে রাগী, মেজাজী মানুষ বলে মনে হবে। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন প্রাণখোলা, উদার, বুদ্ধিদীপ্ত ও মহত্ হূদয়ের একজন মানুষ। তেজগাঁও শ্রমিক এলাকায় মানুষের কাছে মনি ভাই ছিলেন দেবতুল্য অভিভাবক। তিনি প্রতিটি শ্রমিকের ঘরের খবর রাখতেন এবং সাধ্যানুযায়ী তাদের সকল সমস্যার সমাধান করে দিতেন।’

যুবলীগের প্রতিষ্ঠা কমিটির সদস্যদের একজন প্রথম কংগ্রেসে নির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ আহমদ ফারুক বলেছেন, ‘মনি ভাই ছিলেন খুবই তীক্ষ বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনি খুবই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।’ তিনি ছিলেন খুবই সাহসী ও দূরদর্শী। একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির মিছিলে পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হন। তারা প্রতিবাদ সভা আহ্বান করে। মনি ভাই ঘোষণা দেন, একই দিন যুবলীগ সেখানে সভা করবে। শেষ পর্যন্ত ওরা আর সভা করেনি।

বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য, শেখ মনির মতো অনন্য গুণাবলিসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতার জীবনপ্রদীপ মাত্র ৩৬ বছর বয়সে নিভে গেল। ১৫ আগস্ট জাতির পিতার সঙ্গে যদি শেখ মনি নিহত না হতেন, তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। মুজিব হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধী জিয়া-এরশাদরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করতে পারতেন না। জাতির জনক হত্যার বিচারের জন্য বাংলার মানুষকে সাড়ে তিন দশক অপেক্ষা করতে হতো না। পিতা হত্যার পরপরই প্রতিরোধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠত।’

জন্মদিনে স্বাধীনতার অন্যতম রূপকার শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ যুবনেতা, মুজিব বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা কমান্ডার, দেশমাতৃকার সূর্যসন্তান শেখ ফজলুল হক মনির পুণ্য স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। জয় বাংলা।

n লেখক :একাত্তরে দাউদকান্দি থানা মুজিব বাহিনীর কমান্ডার