মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক স্মৃতিতে অ্যাডভোকেট মো. আজিজুর রহমান, এমএনএ

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৪৩

আজ ৪ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ সংগঠক, ১৯৭১ সালে পশ্চিমাঞ্চল ক জোনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জননেতা অ্যাডভোকেট মো. আজিজুর রহমানের ২৯তম মৃত্যুবাষির্কী। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী। তারা একই সঙ্গে বেকার হোস্টেলে থাকতেন। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী হিসেবে রাজনীতি করতেন কলকাতায়।

১৯৬৭ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত দুই দফায় তিনি দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সভাপতি। ১৯৭১ সালে প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হলে দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সভাপতি হিসাবে তিনি ছিলেন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের নির্বাচিত আহ্বায়ক। দিনাজপুর শহরের পাহাড়পুর মহল্লায় তার বাসায় বিদ্রোহের সূত্র ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা তিনি উত্তোলন করেন। ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি সৈন্যদের দখলে দিনাজপুর চলে গেলে, বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আঙ্গিক বদলে তাকে সভাপতি করে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় পরিষদ গঠিত হয়। একাত্তরে জুলাই মাসে যুদ্ধ সেক্টরগুলো পূর্ণতা পাবার আগ পর্যন্ত এ পদাধিকারবলেই মুক্তিযুদ্ধকালীন মো. আজিজুর রহমান তার লেটারহেড প্যাডে অসংখ্য নির্দেশনা জারি করেছেন। মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরগুলো সম্পন্ন করলে, তাকে মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর এবং ৬ নম্বর সেক্টর (অর্ধেক) অঞ্চলের লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদমর্যাদায় সিভিল অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজার, ফ্রিডমফাইটার্স রিক্রুটিং ও লিয়াজোঁ অফিসার পদে দায়িত্ব প্রদান করে। জেনারেল ওসমানী স্বাক্ষরিত মুজিবনগর সরকার কর্তৃক ৩০ আগস্ট জারি করা গোপন পরিপত্র নং: ০০০৯জি/২ অনুযায়ী তিনি ছিলেন উক্ত সেক্টরের সব মুক্তিযোদ্ধার রিক্রুটিং, অস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং ক্যাম্প পরিচালনায় সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত তরঙ্গপুরে ৭ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তরেই ছিল তার অফিস। 

মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত সেই গোপন পরিপত্র অনুয়ায়ী উক্ত সেক্টরের সামরিক কমান্ডার এবং অধীনস্ত—সবার জন্য বেসামরিক বিষয়ে তার নির্দেশ মানাটা ছিল বাধ্যতামূলক। উল্লেখ্য, তিনি পশ্চিমাঞ্চল প্রশাসনিক ক জোনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। মুক্তিযোদ্ধাদের অবিকৃত তালিকার ‘লাল বই’ খ্যাত দলিলে মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব কাঠামোর লিখিত দলিলের ৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘স্বাধীনতার বীর সেনানী, স্মরণীয় যারা বরণীয়  যারা’ শিরোনাম অধিভুক্ত ক্রম অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে অ্যাডভোকেট মো. আজিজুর রহমানের কোড ০৭০০০০০০২১।

ইতিহাসের নিরিখে দেখা যায়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিনাজপুর শহরে ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রথম দিনাজপুর জেলা কমিটি গঠন করে দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য এবং তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর অ্যাডভোকেট মো. আজিজুর রহমানকে প্রথম সহসভাপতির দায়িত্ব প্রদান করেন। প্রথম সভাপতি হলেন রহিমুদ্দিন উকিল সাহেব; কিন্তু ১৯৬৬ সালের জুন মাসে ছয় দফা ঘোষণার পর দল ছেড়ে দিলেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলীও চলে গেলেন জেনারেল আইয়ুব খানের পিডিবিতে। জনতার নেতা অ্যাডভোকেট মো. আজিজুর রহমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে রাজপথে রুখে দাঁড়ালে দৃশ্যত সভাপতি হয়ে উঠলেন জনমানসে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রায় ২০০ মাইল বিস্তৃৃত বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে টিনের চোঙা হাতে ছুটে অকুতোভয় নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিয়ে ক্রমান্বয়ে দলকে চাঙা রাখেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অক্টোবরের ১০ তারিখে দিনাজপুর জেলা সফরে গেলে সফরের সংবর্ধনা কমিটির সভাপতি ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. আজিজুর রহমান।

মুক্তিযুদ্ধে মো. আজুিজর রহমানের নেতৃত্বের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক শাসক মুুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সামরিক শাসক দেশদ্রোহিতা ও ৩ হাজার লোককে গণহত্যার অভিযোগ এনে অক্টোবর মাসে সামরিক আদালতে তাকে হাজির হতে সমন জারি করে এবং পরে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ১৭ আগস্ট ১৯৭১ দুই দফায় ৩০ এমএনএকে সামরিক আদালতে তলব করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে ঠাকুরগাঁয়ের মো. আজিজুর রহমানের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ সহযোগিতা ও ৩ হাজার লোকের হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। যুদ্ধের সময় দেখা যায়, তিনি কয়েক দফা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি একমাত্র নেতা, যিনি মিত্রবাহিনীর অগ্রগামী দলের সঙ্গে যুদ্ধ করে ৪ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও প্রবেশ করে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দেন। তিনি ১৯৭১ সালে ২০ ডিসেম্বর দিনাজপুর শহরের গোরে শহিদ ময়দানে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর উপস্থিতিতে বিজয় উত্সব অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন। তিনি ঐ অঞ্চলে শরণার্থী প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনে নেতৃত্ব দেন। তিনি ছিলেন তুখোর মেধাবী ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন এক নেতা। যার দুয়ার সবার জন্য ছিল উন্মুক্ত। ১৯২০ সালের ১ নভেম্বর তত্কালীন ঠাকুরগাঁও মহকুমার মোহম্মদপুর গ্রামে স্বদেশি বিপ্লবী মওলানা আকিমুদ্দিন সরকার ও মা আলেকজান নেসার কোল আলো করে তিনি  জন্ম নেন।

দেশের এমন এক সূর্য সন্তানের ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করি। জয়গান গাই তার দেশপ্রেমের। 

n লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক