সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেছে পুলিশ। ঘটনার দুই মাসেরও বেশি সময় পর গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সিলেটের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবুল কাশেমের আদালতে সাইফুর, রনি, তারেক, অর্জুনসহ আট জনকে অভিযুক্ত করে গণধর্ষণ ও অস্ত্র মামলায় দুটি চার্জশিট দাখিল করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য এর সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ১৮ পৃষ্ঠার চার্জশিটে ৫২ জন সাক্ষী রাখা হয়েছে। এদিকে ধর্ষকদের সহযোগী ও তাদের প্রশ্রয়দাতাদের খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছে সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা প্ল্যাটফরম ‘দুষ্কাল প্রতিরোধে আমরা’। তারা বলেছে, এটি একটি অসম্পূর্ণ অভিযোগপত্র। এতে মূল আসামিদের আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে রাত ৮টার দিকে স্বামীকে বেঁধে গৃহবধূকে দল বেঁধে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ মামলায় অভিযুক্তরা হচ্ছে সিলেট বালাগঞ্জ উপজেলার সাইফুর রহমান (৩০), সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদনগরের তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), হবিগঞ্জ সদরের বাগুনীপাড়ার শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), জকিগঞ্জের আটগ্রামের অর্জুন লস্কর (২৫), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুর গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম (২৫), কানাইঘাটের গাছবাড়ী গ্রামের মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), মিসবাউল ইসলাম রাজন ও আইনুদ্দিন আইনুল। এদের মধ্যে রাজন ও আইনুদ্দিন ছাড়া অপর ছয় জন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। তদন্তকালে বাকি দুজনেরও সংশ্লিষ্টতা পায় পুলিশ। রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুমের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যরা সরাসরি ধর্ষণে জড়িত। আসামিদের মধ্যে রাজন ও আইনুদ্দিন ছাড়া অন্যরা স্থানীয় ছাত্রলীগ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত। এদিকে একই সময়ে একই আদালতে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার মামলায় চার্জশিটও দাখিল করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য। এতে ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমান ও আসামি শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনিকে অভিযুক্ত করা হয়। মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) সুহেল রেজা জানান, ধর্ষণের ঘটনার পর ঐ গৃহবধূর স্বামী শাহপরান থানায় মামলা করেন। সেই রাতেই ছাত্রাবাসে সাইফুর রহমানের কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে একটি পাইপগান, চারটি রামদা, দুটি চাকু উদ্ধার করা হয়।
অভিযোগপত্র প্রদানের তথ্যটি নিশ্চিত করে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) বি এম আশরাফ উল্যাহ তাহের বলেন, সকালে আদালতে অভিযোপত্র প্রদান করা হয়েছে। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সাইফুর রহমানকে। এছাড়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আট জনের মধ্যে ছয় জন ধর্ষণে সরাসরি জড়িত, অন্যরা সহযোগিতা করেছে। অভিযোগপত্রে সরাসরি ধর্ষণে জড়িত হিসেবে নাম এসেছে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন আইনুল ও মিসবাউল ইসলাম রাজনের। ধর্ষণে সহায়তা করেন রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুম। এ মামলায় সবাই গ্রেফতার হয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে। আসামিরা সবাই স্বীকারোক্তি দিয়েছে আদালতে। এর আগে গত ৩০ নভেম্বর ধর্ষণের ঘটনার ডিএনএ প্রতিবেদন আদালতের মাধ্যমে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এসে পৌঁছায়। ডিএনএ প্রতিবেদনে ধর্ষণের সঙ্গে সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি ও অর্জুন লস্করের সম্পৃক্ততার সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে নববিবাহিত স্ত্রীকে প্রাইভেট কারে করে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন নগরীর দক্ষিণ সুরমার জৈনপুর এলাকার এক যুবক। সন্ধ্যার দিকে টিলাগড়ে এমসি কলেজের মূল ফটকের সামনে থামেন তারা। এ সময় কয়েকজন তরুণ এসে প্রাইভেট কারসহ দম্পতিকে এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে জোর করে নিয়ে যায়। পরে স্বামীকে ছাত্রাবাসে আটকে রেখে স্ত্রীকে প্রাইভেট কারের মধ্যেই ধর্ষণ করে। ঘটনার বিচার ও নারী নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে রাস্তায় নামে সাধারণ মানুষ। এ ঘটনার তিন দিনের মধ্যে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে আসামিদের গ্রেফতার করে পুলিশ। রিমান্ড শেষে সবাই ধর্ষণের দায় স্বীকার করে সিলেটের বিভিন্ন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। এ ঘটনায় জড়িত চার আসামির ছাত্রত্ব ও সার্টিফিকেট বাতিল করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। স্থায়ীভাবে এমসি কলেজ থেকেও তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।
গডফাদারদের চিহ্নিত করার দাবি
‘দুষ্কাল প্রতিরোধে আমরা’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই অভিযোগপত্র আমাদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ডিএনএ রিপোর্ট-নির্ভর একটি প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এতে পুলিশের নিজস্ব তদন্তের কোনো ছাপ নেই। আসামিরা কাদের সহযোগিতায় পালাল, কারা তাদের আত্মগোপনে সহায়তা করেছে, কাদের সহযোগিতায় বন্ধ ছাত্রাবাসে তারা আস্তানা গড়ে তুলল—এসব ব্যাপারে অভিযোগপত্রে কিছু উল্লেখ নেই। তাই আমরা মনে করি, এটি একটি অসম্পূর্ণ অভিযোগপত্র। পুলিশ ধর্ষকদের নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের আড়াল করার চেষ্টা করেছে। চাঞ্চল্যকর এই মামলার সম্পূরক চার্জশিট প্রদান করে গডফাদারদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
