কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ শরণার্থী শিবির থেকে রোহিঙ্গাদের একটি দল অবশেষে স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যাচ্ছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ২০টি বাসে ভাসানচরের উদ্দেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে রওয়ানা দেন সংশ্লিষ্টরা।
উখিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠ থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসগুলোতে সহস্রাধিক রোহিঙ্গা থাকতে পারে বলে ধারণা রোহিঙ্গা নেতাদের। নিত্য ব্যবহার্য মালামাল নিয়ে সকালে তারা গাড়িতে করে ট্রানজিট পয়েন্টে যান বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ ব্যাপারে প্রশাসনের কেউ কথা না বললেও র্যাব-১৫ কমান্ডার আজিম আহমেদ জানিয়েছেন, সকাল থেকেই তারা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। এসংক্রান্ত কিছু ছবি ও ভিডিও সরবরাহ করেন তিনি।
এদিকে বিবিসি জানায়, কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভাসানচরে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার দিনেই দুটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশের সরকারের উচিত একটি স্বচ্ছ স্থানান্তর প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শরণার্থীদের বুঝে-শুনে সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এবং দ্বীপটিতে যাওয়া-আসার অনুমতি সাপেক্ষে স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। সেই সঙ্গে জাতিসংঘের আহ্বান অনুযায়ী একটি স্বাধীন কারিগরি এবং সুরক্ষাবিষয়ক মূল্যায়ন পরিচালনা করা উচিত।
এছাড়া ভাসানচরে যাওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা যেন সব তথ্য জেনে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বুধবার সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেওয়ার যে পরিকল্পনা সরকার চূড়ান্ত করেছে, তার সঙ্গে জাতিসংঘের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্যাম্প কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, কক্সবাজারের কয়েকটি শরণার্থী ক্যাম্প থেকে এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে বাসে করে চট্টগ্রামের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে। সেখান থেকে নৌবাহিনীর জাহাজে করে আজ শুক্রবার তাদের ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হবে।
বিভিন্ন ক্যাম্পের মাঝিরা জানান, অনেক রোহিঙ্গা পরিবার স্বেচ্ছায় ভাসানচর যেতে উদ্যোগী হচ্ছে। উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিয়ে যেতে উখিয়া কলেজ মাঠে অস্থায়ী ট্রানজিট পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে। মাঠে একাধিক কাপড়ের প্যান্ডেল ও বুথ তৈরি করা হয়েছে। এসংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনের কেউ মুখ খুলতে না চাইলেও রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপক আয়োজন চোখে পড়ে আরো কয়েকদিন আগে থেকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যার পর বেশ কিছু রোহিঙ্গা ট্রানজিট পয়েন্টে চলে আসেন। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে আসা শুরু করেন অন্যরাও। আগে থেকে প্রয়োজনীয় পরিবহন ব্যবস্থা ও খাদ্যসামগ্রী মজুত করা হয়। উখিয়া কলেজ মাঠ থেকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর শুরু হয় বেলা সোয়া ১১টা হতে।
কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে নিয়ে সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে নৌবাহিনীর ১৪টি জাহাজ। ভাসানচরে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের জন্য সেখানে মজুত করা হয়েছে প্রায় ৭০ টন খাদ্যসামগ্রী। প্রথম দুই মাস তাদের রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হবে। এরপর নিজ নিজ বাসস্থানেই তারা রান্না করতে পারবেন।
সূত্র মতে, ইতিপূর্বে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর কার্যক্রম ঘিরে ভাসানচর দ্বীপ ঘুরে আসে ২২টি এনজিওর প্রতিনিধি দল। সরকারের পরিকল্পিত আয়োজনে সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আন্তর্জাতিক একটি এনজিওর কর্মকর্তা বলেন, বারবার অভিযোগ উঠেছে এনজিওদের প্ররোচনায় রোহিঙ্গারা ভাসানচর যাচ্ছে না। তাই এবারের যাত্রায় কোনো এনজিও রোহিঙ্গাদের বিষয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। তবে বেশ কিছু এনজিও সেখানে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
সূত্র আরো জানায়, উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ে ঠাসাঠাসির বসবাস ছেড়ে ভাসানচরে যেতে ৩ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা রাজি হয়েছেন। তবে ৪ থেকে ৫ হাজার রোহিঙ্গা আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে গণমাধ্যমে জানিয়েছিলেন শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ রেজওয়ান হায়াত।
ভাসানচরে যেতে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের অনেকে জানান, তারা ভাসানচর পরিদর্শন শেষে ফিরে আসা রোহিঙ্গা নেতাদের মুখে সেখানকার বর্ণনা শুনে সেখানে যেতে রাজি হয়েছেন। তাদের মতে পাহাড়ের ঘিঞ্জি বস্তিতে বসবাসের চেয়ে ভাসানচর অনেক নিরাপদ হবে। এছাড়া ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য নির্মিত অবকাঠামো অনেক বেশি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বলে মনে হয়েছে তাদের।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘ দিন ধরে প্রচার পেয়ে আসছে যে, ১ লাখ রোহিঙ্গা ভাসানচর যাচ্ছেন। অবশেষে এই যাত্রা শুরু হওয়ায় উখিয়া-টেকনাফের সাধারণ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করছেন। নোয়াখালীর হাতিয়ায় সাগরের মধ্যে ভেসে থাকা ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। বসবাসের যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা দেখতে গত সেপ্টেম্বরে দুই নারীসহ ৪০ রোহিঙ্গা নেতাকে সেখানে নিয়ে যায় সরকার। তারা ভাসানচরের আবাসন ব্যবস্থা দেখে মুগ্ধ হন। ক্যাম্পে ফিরে তারা অন্যদেরও ভাসানচরে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন।
ইত্তেফাক/জেডএইচ
