মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের পরাজয়ের কথা নিশ্চয়ই সকলেরই মনে আছে। হিলারির পরাজয়ের নেপথ্যে অনেক কারণই রহিয়াছে, তবে একটি ইস্যুকে রিপাবলিকানরা সেই সময় বড় করিয়া তুলিয়া ধরিয়াছিল। তাহা হইল সরকারি কাজে ব্যক্তিগত ইমেইলের ব্যবহার। হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তাহার বাড়ির সার্ভার হইতে যেই সকল ইমেইল পাঠাইয়াছিলেন তাহার অন্তত ২২টিতে সরকারের গোপন তথ্য ছিল। এই ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহারে রাষ্ট্রীয় গোপন কাজে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়াছিলেন বলিয়া নিদারুণ সমালোচনার মুখোমুখি হইয়াছিলেন হিলারি। তাহার পর তো তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিতই হন। তবে কেবল হিলারি নহেন হোয়াইট হাউজের শীর্ষ উপদেষ্টা হিসাবে ট্রাম্পের কন্যা ইভানকাও ২০১৭ সালে তাহার ব্যক্তিগত ইমেইল হইতে হোয়াইট হাউজের অফিশিয়াল আলাপ-আলোচনার শতাধিক বার্তা পাঠাইয়াছিলেন বলে বিশেষভাবে সমালোচিত হইয়াছিলেন। যদিও হিলারির দায়িত্ব ছিল অনেক বেশি স্পর্শকাতর।
স্পষ্টতই সারা বিশ্বেই রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহার এই সময়ে গুরুতর দায়িত্বহীনতা হিসাবেই বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশও ইহার বাহিরে নহে। কারণ জিমেইল, ইয়াহু, হটমেইল ইত্যাদি ডোমেইনগুলি বিদেশি ও তৃতীয় পক্ষের। এই সকল ডোমেইনে আদান-প্রদান করা সকল ইমেইল তৃতীয় পক্ষের ডাটাবেস বা সার্ভারে জমা থাকে। এইভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্পর্শকাতর তথ্য বাহিরে চলিয়া যাইতে পারে। কিন্তু সরকারি সার্ভার ব্যবহারে এই ঝুঁকি থাকে না। এইজন্য ২০১৮ সালের ২২ মে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করিয়া জানাইয়াছে যে, সরকারি কাজে ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহার করা যাইবে না। কিন্তু অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীই এখনো ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহার করিতেছেন। এই সংক্রান্ত কিছু প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, সরকারি ডোমেইনে ইমেইলের পূর্ণ বাস্তবায়ন হইয়াছে এমন মন্ত্রণালয়ের সংখ্যাও হাতেগোনা। অথচ ইমেইল নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যেককেই মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও সংস্থার নামসহ ডট বিডি ডোমেইনে একটি ইমেইল আইডি তৈরি করিয়া সরকারি কাজে মেইল আদান-প্রদান করিতে হইবে। এই ইমেইল আইডি তাহারা শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজেই ব্যবহার করিতে পারিবেন। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এই ইমেইল সেবা প্রদান করিতেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেড় বত্সর পার হইবার পরও সরকারি ইমেইল ব্যবহারে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সচেতনতা দেখা যাইতেছে না। অথচ সরকারি ইমেইল ব্যবহারের জন্য নীতিমালার অনুধাবনে সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব ও অতিরিক্ত সচিবদের লইয়া ধাপে ধাপে তিন দিন করিয়া ওয়ার্কশপও হইয়াছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, অনেক সরকারি ইমেইল আছে যেইগুলি দীর্ঘদিন ধরিয়া অব্যবহূত থাকিতে থাকিতে সংশ্লিষ্ট অনেকের পাসওয়ার্ডও মনে নাই। এই সকল ক্ষেত্রে অনেক কর্মকর্তা তাহা পদের নাম দিয়া সঙ্গে দুই-একটি সংখ্যা বা শব্দ যুক্ত করিয়া বেআইনিভাবে জিমেইলে অ্যাকাউন্ট খুলিয়াছেন। মজার বিষয় হইল, অনেকে এইগুলিও ঠিকমতো ব্যবহার করিতেছেন না। অর্থাত্ তাহারা ইমেইলের ব্যাপারেই পুরোপুরি উদাসীন।
ডিজিটাল বাংলাদেশ তো কেবল নামেই হইবে না। জানা গিয়াছে, ইমেইল আইডির ব্যবহার আরো সহজ করা হইতেছে। ইমেইলকে ই-নথির সঙ্গে যুক্ত করা হইবে। ইহাতে সাধারণ মানুষ সরকারি দপ্তরে ইমেইল করিলে ই-নথিতে নোটিফিকেশন দেখাইবে। আমরা আশা করিব, উন্নত বিশ্বের সহিত তাল মিলাইয়া বাংলাদেশেও প্রকৃত ডিজিটাল ব্যবস্থা কার্যকর হইবে। সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তার এই ক্ষেত্রে উদাসীনতা কিংবা দায়িত্বহীনতার সুযোগ নাই।
