দেশের ১৯টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে সরাসরি গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এই ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৯টি সাধারণ এবং ১০টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার অধীনে মানবিক, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান—এই তিন বিষয়বস্তুর ওপর পরীক্ষা নেওয়া হবে। এসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা হবে। গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় গত মঙ্গলবার (১ ডিসেম্বর) ইউজিসির এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে তিনটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে বড় চার বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এই সমন্বিত ভর্তিতে আসবে না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছে। তারা প্রত্যেকেই পৃথকভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেবে। এজন্য ১ ডিসেম্বরের বৈঠকে এই চার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের ডাকা হয়নি। তবে ইউজিসি আশা প্রকাশ করছে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর নেতৃত্বে এ বছর থেকেই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় আগে থেকেই জিপিএর ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করে থাকে।
২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার যুগ্ম-আহ্বায়ক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মীজানুর রহমান বলেন, ‘এই গুচ্ছ পদ্ধতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের ফলে করোনাকালে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের দেশের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোটাছুটির প্রয়োজন হবে না। এতে একদিকে যেমন করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যাবে, অন্যদিকে তেমনি অভিভাবকদের আর্থিক সাশ্রয়ও হবে।’
সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজ নিজ শর্ত ও চাহিদা উল্লেখ করে শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করবে। ভর্তি পরীক্ষার প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজ নিজ শর্ত ও চাহিদা মোতাবেক শিক্ষার্থী ভর্তি করবে। এজন্য আলাদা করে কোনো ধরনের ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে না। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ব্যাংক থেকে নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভর্তি পরীক্ষার বিধিবদ্ধ নিয়মানুসারে ভর্তি পরিচালনা করবে। সম্মিলিত ইউনিটগুলোতে বিভাগ পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে। প্রতিটি গুচ্ছে একটি করে পরীক্ষা নেওয়া হলেও সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তিনটি (সায়েন্স, আর্টস ও কমার্স) ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, কৃষিবিষয়ক সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বছর স্নাতক শ্রেণিতে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার জন্য বহু দিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি মৌসুমে ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ লাখো শিক্ষার্থীর হয়রানির প্রসঙ্গ প্রতি বছরের আলোচনার বিষয়। তবে এবার করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যে এটি আরো মারাত্মক চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই সময়টা কাটে ছাত্রছাত্রীদের টেনশনে। কোথাও ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের মধ্যে এই দুশ্চিন্তা কাজ করে। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া, সেখানে থাকার চিন্তা—সব মিলিয়ে বেশ বড় ধরনের সংগ্রাম করতে হয় এ সময়। একজন শিক্ষার্থী যে কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র একটি বিষয়ে ভর্তি হয়। অথচ তাকে অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে দেশময় ঘুরে বেড়াতে হয় এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এতে অর্থ ও সময় তো নষ্ট হয়ই, অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে ছোটাছুটির কষ্ট করতে হয় তার চেয়েও বেশি। জীবনযুদ্ধ থেকে কোনো অংশে কম নয় এই ভর্তিযুদ্ধ। প্রতি বছর যে হারে পাশকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসনসংখ্যা তার থেকে অনেক কম। তারপর আবার রয়েছে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়, পছন্দের বিষয় নির্বাচন। সব মিলিয়ে বিশাল চাপ। উচ্চশিক্ষার জন্য তাই তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। কিন্তু এই তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তাদের। সবচেয়ে জনপ্রিয় যে সমাধানটি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনায় এসেছে, তাহলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা। বর্তমানে শুধু মেডিক্যাল কলেজগুলোতে এবং কৃষিবিষয়ক সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বছর স্নাতক শ্রেণিতে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মত থাকলেও আমাদের বিরাট এই কর্মযজ্ঞ যে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে আয়োজন করা হয়, তাদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান মহামারির করোনা ভাইরাসের মধ্যে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পদ্ধতি চালু করা দরকার।
n লেখক :ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
