বিশ্ব মৃত্তিকা দিবসে

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৩৩

মো. শহিদুল্লাহ

মাটি নির্জীব হলেও অনেক উপকারী অণুজীব ও উপকারী পোকার আশ্রয়স্থল। মাটিকে তাই লিভিং সয়েল বলা হয়। যে মাটির ওপর ভর করে গাছ প্রতিনিয়ত আমাদের অক্সিজেন দেয়, ক্ষুধা নিবারণে খাবার জোগায়, সে মাটির গুরুত্ব অনেক সময় আমরা অনুধাবন করি না। অধিক ফলন পেতে জমিতে বেশি বেশি সার ও বালাইনাশক দিয়ে মাটিতে বিদ্যমান উপকারী জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে ফেলি। উত্পাদন বাড়াতে জমিতে বছরে কত বেশি সংখ্যকবার ফসল ফলানো যায় তা নিয়ে চেষ্টার অন্ত নেই। এখন জমিতে বছরে চার ফসল ফলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার একইসঙ্গে দুই বা ততোধিক ফসল উত্পাদনে জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে মাটিতে বিদ্যমান জৈব পদার্থ ও পুষ্টি উপাদানের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি মাটির উত্পাদনশীলতা বজায় রাখা জরুরি। মাটি উত্পাদনক্ষম ও সুস্থ না থাকলে ভবিষ্যতে ফসল উত্পাদন হুমকির মুখে পড়বে।

টেকসই মাটি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে আজ সপ্তমবারের মতো বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস পালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ২০১৩ সালে প্রথম ৫ ডিসেম্বর দিবসটি পালন করে। মাটির ক্ষয়রোধ, দূষণরোধ, স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য স্বাস্থ্যকর মাটি প্রভৃতি প্রতিপাদ্য নিয়ে মৃত্তিকা দিবস পালিত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘মাটি বাঁচিয়ে রাখুন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করুন’।

বাংলাদেশ উর্বর মাটির অধিকারী। বলা হয়ে থাকে এদেশের মাটিতে সোনা ফলে। বেশি ফলন পেতে মাটির ওপর ক্রমাগত চাপ ও মাটির স্বাস্থ্য সম্পর্কে উদাসীনতা সোনার মাটিকে বিরান ভূমিতে পরিণত করতে পারে! অসুস্থ তথা অনুর্বর মাটিতে ফসল ফলানো কত কষ্টকর তা আফ্রিকা অঞ্চলের কৃষকগণ হাড়ে হাড়ে টের পান। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্বোফুরান জাতীয় কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে; কারণ বিশেষ করে কার্বোফুরানের বিষক্রিয়ায় মাটিতে বিদ্যমান উপকারী অণুজীব ও ছোট প্রাণী যেমন কেঁচো, উইপোকা, সেন্টিপিড, মিলিপিড প্রভৃতি মারা পড়ে, ফলে দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়।

বাংলাদেশের মাটিতে জৈব পদার্থ শতকরা এক ভাগেরও কম, যেখানে স্বাস্থ্যকর উত্পাদনশীল মাটিতে শতকরা ৫ ভাগ জৈব পদার্থ থাকা প্রয়োজন। মাটিতে জৈব পদার্থ বাড়াতে সবুজ সার, খামারজাত সার, ভার্মি কম্পোস্টের ব্যবহার বাড়াতে হবে। রাসায়নিক সারের পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক জৈব কৃষি প্রর্বতন করে জমিতে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার শূন্যতে নামিয়ে আনা। যেহেতু জৈব কৃষিতে ফলন ও উত্পাদন অপেক্ষাকৃত কম হয়, সেহেতু প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জৈব কৃষিতে উদ্বুদ্ধকরণে নগদ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে; আপাত দৃষ্টিতে ব্যয়বহুল মনে হলেও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটা হবে কার্যকর বিনিয়োগ। টেকসই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে মাটির সুষ্ঠু ও লাগসই ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস উপলক্ষ্যে পুরস্কার ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। সংগঠকদের উত্সাহ দিতে ‘কিং ভূমিবোল বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস’ পুরস্কার দেওয়া হয়। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, এনজিও, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বা অন্য যে কোনো সংস্থা এ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে পারে। স্থানীয় ও জাতীয় ভাবে মাটির অবক্ষয়ের সমস্যা মোকাবিলার সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে নীতি নির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে প্রত্যক্ষ অবদানের জন্য ‘গ্লিংকা ওয়ার্ল্ড সয়েল প্রাইজ’ দেওয়া হয়। পরিশেষে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাটি তথা কৃষিজমি রক্ষায় এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অতিরিক্ত উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা