শিশুদের জন্য আমরা

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:৩৪

রিফাত মুনীর ইতি

কোভিড-১৯ পালটে দিয়েছে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, সম্ভবত সবচাইতে বড় মাশুলটা গুনতে হচ্ছে শিশুদের। বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শিশুদের দীর্ঘ গৃহবন্দিত্ব অসহনীয় হয়ে উঠেছে; খেলার মাঠগুলো তাদের পদচারণাবিহীন; শিশুরা একরকম  নির্জন জীবন যাপন করছে!

এর মধ্যে বেড়েছে শিশু নির্যাতন,  গ্রাম ও শহরতলিতে বাল্যবিবাহের হিড়িক। যদিও  স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় কিছুটা হলেও রক্ষা পাচ্ছে মেয়েগুলো, তবু সেই হার ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। আমরা যতই বলি— শিশুদের জন্য নিরাপদ, বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার কথা; কিন্তু তা সীমাবদ্ধ প্রতিশ্রুতিতেই, বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। এ কারণেই শিশু নির্যাতন কমানো যায়নি, কমেনি শিশুশ্রম। সব শিশুর  শিক্ষা  নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও আমাদের ঘাটতি আছে, বেড়েছে ঝরে পড়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে করণীয় নির্ধারণে এগিয়ে  আসতে হবে আমাদেরই, নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। শিশুদের  শিক্ষাকে আনন্দদায়ক করার উপায় বের করতে হবে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে  যেহেতু  অনলাইনে  ব্যস্ততা বেড়েছে শিশুদের, সেহেতু অনলাইনে তাদের গঠনমূলক, শিক্ষণীয়  বিষয়গুলোর চর্চা যাতে ঠিকভাবে হয়, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব অভিভাবকদের। শিশুদের সৃজনশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে,  তাদের উদ্ভাবনী শক্তির ওপর নিয়ত পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। বাড়ির সামনে, উঠোনে, বারান্দায় কিংবা ছাদে বৃক্ষরোপণ ও তার পরিচর্যাতে সময় ব্যয় করার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে অভিভাবকদের। স্বাস্থ্যবিধি মেনে বড় বড় উদ্যান কিংবা পার্কে প্রকৃতির সাহচর্যে নিয়ে যাওয়া উচিত শিশুদের, তাদের বেড়ে উঠতে দিতে হবে প্রাকৃতিক খোলা হাওয়ায়।

অন্যদিকে, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করার শিক্ষাও শিশুদের দেওয়া উচিত পরিবার থেকেই। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের প্রতি পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পালটে দেওয়ার সময় এসেছে। এখনো মেয়েদের শিক্ষাকে অনেকক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় মনে করা, তাদের সামাজিকভাবে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখার প্রবণতা পুরোপুরি দূর করা যায়নি। ফলে কন্যাশিশুরা নিজেরাই নিজেদের মানুষ হিসেবে ভাবতে পারেনি, আছে যৌতুকসহ নারী নির্যাতনের আশঙ্কাজনক হার বৃদ্ধি, ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার সাক্ষী হচ্ছে দেশ নিয়তই।

শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য আমাদের কর্মপন্থা নির্ধারণের আগে ভাবতে হবে আদতে কোন উদাহরণ আমরা রেখে যাচ্ছি। আমরা দুর্নীতি, ঘুষ, অর্থ কেলেঙ্কারিতে জড়িত হয়ে ওদের সততার উপদেশ দিতে পারি না। যে পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যের অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত হওয়ার প্রমাণ মেলে, সেই পরিবারের শিশুটি মেয়েদের অশ্রদ্ধা করতে আর তাদের হীন, দুর্বল ভাবতেই শিখবে আমরণ। যে পরিবারে নিয়ত মিথ্যা ও লোকঠকানো কার্যক্রম চলে, সেখানে একটি শিশুর সত্যান্বেষী হওয়ার সম্ভবনা নেই বললেই চলে, আমাদের  আকাশচুম্বী চাহিদা, লোভ ও লোকদেখানো আড়ম্বর শিশুদের ভীষণভাবে প্রলুব্ধ করে। শিশুদের সামনে তাই বাবা-মাসহ অভিভাবক শ্রেণিকে আদর্শ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা দরকার।

লেখাটি শেষ করতে চাই—কর্মজীবী, পথশিশুদের কথা বলে। নিয়ত আমাদের চারপাশের ছিন্নমূল শিশুরা ভয়ংকরভাবে মাদক পাচারসহ নানান অসামাজিক কাজে ব্যবহূত হচ্ছে; কিংবা যতই এদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই না কেন, আমাদের আত্মিক চাওয়া কতটা সে প্রশ্ন বিশাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই শিশুদের ভবিষ্যত্ সুন্দর, মসৃণ ও আনন্দদায়ক করতে হবে, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের বেড়ে ওঠাকে নিষ্কণ্টক করা দরকার। শিশুদের ওপরেই নির্ভর করছে আমাদের  ভবিষ্যত্, এক উন্নত মানবিক বাংলাদেশ।

ঢাকা