জলাশয় ভরাটের জমজমাট ব্যবসা
মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি
গোমতী নদীর কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কয়েকটি স্থান দিয়ে প্রতিরক্ষা বাঁধ কেটে পাইপ স্থাপন করে দিনে-রাতে নদীর বালু নিয়ে জলাশয় ভরাট করছে প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীর একাধিক সিন্ডিকেট। দুর্ঘটনা ঠেকাতে তারা নিজেরাই বাঁধের কাটা অংশে লাল পতাকা টানিয়ে দিয়েছে। শুক্রবার নদীর বাঁধ এলাকায় ঘুরে এমনই দৃশ্য দেখা গেছে। এর আগে জলাশয় ভরাটের উদ্দেশ্যে নদীর বাঁধের নিচ দিয়ে গর্ত (সুড়ঙ্গ) করে একই সিন্ডিকেট পাইপ স্থাপন করলে প্রশাসন পাইপগুলো জব্দ করেছিল। প্রকাশ্যে বাঁধ কেটে পাইপ স্থাপনের কারণে কুমিল্লা স্থলবন্দরে যাতায়াতের নদীবাঁধ/পাকা সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এক্ষেত্রে প্রশাসন নির্লিপ্ত। এমন অভিযোগ করে অবিলম্বে পাইপগুলো অপসারণ, জলাশয় ভরাট বন্ধসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান এলাকাবাসী।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের কোথাও কোথাও কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তর সতর্কীকরণ গণবিজ্ঞপ্তির সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে। তবুও ঠেকানো যাচ্ছে না মাটিদস্যুদের দাপট। তারা প্রকাশ্যে গোমতী থেকে অবৈধভাবে বালু-মাটি নিয়ে গোমতীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ও রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত করে পাইপের সাহায্যে বালু দিয়ে দিঘি ও নিচু এলাকা ভরাট করছে। বাঁধের এসব স্থানে দুর্ঘটনা ঠেকাতে মাটিদস্যুরাই টানিয়ে দিয়েছে লাল পতাকা। এই চিত্র গোমতী বাঁধের কুমিল্লা শহরতলীর শুভপুর ও ডুমুরিয়া চাঁনপুর এলাকার। জানা যায়, প্রায় দেড় মাস আগে আদর্শ সদর উপজেলার কয়েকটি এলাকায় জলাশয় ভরাটের উদ্দেশ্যে একাধিক সিন্ডিকেট নদী বাঁধের নিচ দিয়ে গর্ত (সুড়ঙ্গ) করে পাইপ স্থাপন করে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষ অভিযান পরিচালনা করে এসব পাইপ জব্দ করে। এতে ঐ সিন্ডিকেটের কার্যক্রম কিছুদিন বন্ধ থাকে। সম্প্রতি ঐ সিন্ডিকেট প্রকাশ্যেই বাঁধের/রাস্তার উপরিভাগ কেটে পাইপ স্থাপন করে নদীর বালু নিয়ে জলাশয় ভরাট শুরু করে। এরই মধ্যে তারা আদর্শ সদর উপজেলার বদরপুর এলাকায় ফসলি জমি এবং শহরতলীর শুভপুর এলাকায় পৃথক দুটি স্থানে জলাশয় ভরাটের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। সরেজমিনে নদীবাঁধ এলাকায় গেলে ডুমুরিয়া চাঁনপুরের আলাউদ্দিন, মাসুম ও শুভপুরের মাহফুজুর রহমান, আলী আকবরসহ কয়েক জন জানান, প্রভাবশালী কয়েকটি সিন্ডিকেট ইতিপূর্বে বাঁধে সুড়ঙ্গ করে, এখন বাঁধের উপরিভাগ কেটে পাইপ স্থাপন করে অবৈধভাবে নদীর বালু নিয়ে কয়েক শ বছরের প্রাচীন ভাবনা দিঘিসহ পুকুর-জলাশয় ও আশপাশের নিচু স্থান ভরাট করছে। এতে কুমিল্লা স্থলবন্দরে যাতায়াতের দৃষ্টিনন্দন নদীবাঁধ/সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া অপরিকল্পিতভাবে জলাশয় ভরাটের কারণে শহরতলীর ডুমুরিয়া চাঁনপুর ও শুভপুর এলাকা বর্ষাকালে পানিতে ডুবে বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে। অবিলম্বে পাইপ অপসারণ এবং জলাশয় ও দিঘি ভরাট বন্ধসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তারা। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এগুলো দেখেও না দেখার ভান করছে বলেও তারা অভিযোগ করেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা শাখার সভাপতি ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষার জন্য প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাঁধের ক্ষতি হলে কুমিল্লা শহরকে রক্ষা করা কঠিন হবে। পাউবো-কুমিল্লার পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (পওর) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল লতিফ বলেন, কিছুদিন আগে একটি চক্র জলাশয় ভরাটের জন্য নদীর বাঁধ কেটে পাইপ স্থাপন করেছিল। এসব পাইপ জব্দ করা হয়েছে। পুনরায় সেখানে বাঁধের উপরিভাগে যারা পাইপ স্থাপন করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, নদীর বাঁধ কেটে পাইপ স্থাপন কিংবা পাইপে নদীর মাটি নিয়ে বা যে কোনো উপায়ে জলাশয় ভরাট করা আইনত দণ্ডনীয়। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর-কুমিল্লার উপপরিচালক শওকত আরা কলি জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া কেউ জলাশয় ভরাট করতে পারবে না, এই নির্দেশনা সংবলিত গণবিজ্ঞপ্তির সাইনবোর্ড ঐ এলাকায় টানানো হয়েছে। এলাকাটি পরিদর্শন করে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
