ভাসানচরে রোহিঙ্গা বসতি শুরু

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:১৩

কক্সবাজারের আশ্রয়শিবির থেকে নোয়াখালীর ভাসানচরে পৌঁছেছে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রথম দল। গতকাল শুক্রবার সকালে নৌবাহিনীর ছয়টি ও সেনাবাহিনীর একটি জাহাজে করে মোট ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গাকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হয়। দুপুর ২টার দিকে তারা ভাসানচরে পৌঁছায়। রোহিঙ্গাদের এ সময় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরণ করে নেওয়া হয়। পরে খাওয়াদাওয়া ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নবনির্মিত ঘরবাড়ি বুঝিয়ে দেওয়া হয় রোহিঙ্গাদের। এ সময় অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। কক্সবাজারের ঘিঞ্জি ও অপরিচ্ছন্ন ক্যাম্পের পরিবর্তে ভাসানচরের উন্নত পরিবেশে বসবাসের সুযোগ পেয়ে তারা খুবই খুশি। এ সময় কয়েক জন নতুন আবাসনের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে। 

নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম গতকাল সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে জানান, রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটি শুক্রবার দুপুরে ভাসানচরে পৌঁছায়। প্রথমেই এদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। তাদের জন্য ভাসানচরে আগে থেকেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত আবাসন নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে তুলে দেওয়া হয়েছে। তারা এখন থেকে এখানেই থাকবে।

এর আগে বিকালে ভাসানচর রোহিঙ্গা পুনর্বাসন প্রকল্পের পরিচালক কমোডর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী ব্রিফিং করেন। এ সময় তিনি ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, আগামী এক সপ্তাহ তাদের নৌবাহিনী রান্না করা খাবার সরবরাহ করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। তিনি আরো জানান, সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ২৩টি এনজিও রোহিঙ্গাদের সহযোগিতায় কাজ করে যাবে।ব্রিফিং শেষে দোয়া ও বিশেষ মোনাজাত করা হয়। রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানানো হয়। নৌবাহনীর সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে  বিকাল ৫টায় রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত ৭, ৮, ৯ ও ১০ নম্বর ক্লাস্টারে নিয়ে তাদের থাকার কক্ষগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় কয়েক জন নারী-পুরুষ সাংবাদিকদের কাছে তাদের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে সুরোত জামান নামের এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, ‘আমাদের এখানে না আসার জন্য অনেকে নিষেধ করছে। কিন্তু এখানে এসে দেখি আমাদের থাকার জন্য এত সুন্দর সব ব্যবস্থা, যা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।’ 

এদিকে জেলার সিভিল সার্জন ড. মাসুম ইফতেখার জানান, বৃহস্পতিবার ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য ২০ বেডের একটি হাসপাতাল ও একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এছাড়া বিআইডব্লিউটিসি বয়ারচর, ভাসানচর ভায়া হাতিয়া রুটে একটি যাত্রীবাহী সি-ট্রাক সার্ভিস চালুর অনুমতি দিয়েছে বলে জানা গেছে।

যেভাবে স্থানান্তর :জানা গেছে, কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোতে আশ্রিতদের মধ্যে স্বেচ্ছায় স্থানান্তরে রাজি হওয়া ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গাকে গত বুধবার রাতে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-সংলগ্ন ঘুনধুম ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়। এদের মধ্যে শিশু রয়েছে ৮১০ জন, পুরুষ ৩৬৮ জন এবং নারী ৪৬৪ জন। সেখানে রাত কাটানোর পর বৃহস্পতিবার উখিয়া ডিগ্রি কলেজ ক্যাম্পাস থেকে ২০টি বাসে করে তাদের চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। রোহিঙ্গা বহনকারী বাসগুলোর সামনে ও পেছনে ছিল র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা।

বৃহস্পতিবার রাতে এসব রোহিঙ্গা অবস্থান করে নগরীর পতেঙ্গায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর রেডি রেসপনস বার্থ ও বিএএফ শাহীন কলেজ মাঠের অস্থায়ী ‘ট্রানজিট ক্যাম্পে’। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সাতটি জাহাজে করে ভাসানচরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে তারা। এর আগে সকাল ৬টার দিকে দুটি জাহাজে রোহিঙ্গাদের মোট ১ হাজার ১৯টি লাগেজ ভাসানচরে পাঠানো হয়।

রোহিঙ্গারা ভাসানচরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার পর অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ সামছুদ্দৌজা সাংবাদিকদের জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গা ভাসানচরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। তারা আড়াই-তিন ঘণ্টার মধ্যে সেখানে পৌঁছে যাবে। সেখানে পৌঁছে রিপোর্ট করে খাওয়াদাওয়ার পর তাদের জন্য ভাসানচরে গড়ে তোলা আবাসনে পৌঁছে দেওয়া হবে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরে ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ১৩ হাজার একর জমির ওপর গুচ্ছগ্রামের আদলে ১২০টি গ্রাম নির্মাণ করে ১ লাখ মানুষের জন্য আবাসনব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ছাড়াও এখানে এনজিও কর্মকর্তা, দূতাবাসের কর্মকর্তা, উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের জন্য উন্নত ও আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অব্যাহত নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সেদেশের প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। একই কারণে এর আগেও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন শিবিরে ১২ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের আরো উন্নত পরিবেশে রাখার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ে ভাসানচরে আবাসনব্যবস্থা নির্মাণ করে সরকার। গত মে মাসে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে দুই দফায় নারী-শিশুসহ মোট ৩০৬ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ফিরে আসে। তাদেরও ইতিপূর্বে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধিদল ভাসানচর সফর করে সন্তোষ প্রকাশ করে। তাদের কাছ থেকে সার্বিক ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের একাংশ ভাসানচরে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

কক্সবাজারের মধুরছড়া ডাবল ক্যাম্পের বাসিন্দা সালামত খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘ভাসানচরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য অনেক সুন্দর ঘরবাড়ি করে দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আমাদের অনেকেই আজ সেসব ঘরে উঠেছে। তাদের অবস্থা দেখে আমরাও ভাসানচরে যেতে আগ্রহী। সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে চাই।’