শরণার্থী সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের অনেক ধনী দেশ। অনেক পশ্চিমা দেশে শরণার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত অমানবিক আচরণ হচ্ছে। গত অক্টোবরে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্র্যান্ডি শরণার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ‘পুশ ব্যাক’ প্রক্রিয়াকে হতাশাজনক ও লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেন। তার দাবি, করোনা মহামারির কারণে এই প্রক্রিয়া আরো অনেক বেশি কঠোর হয়েছে।
সংঘাত, দরিদ্রতার কারণে এশিয়া, আফ্রিকার অনেক দেশের মানুষ শরণার্থী হিসেবে কিংবা অভিবাসনপ্রত্যাশী হিসেবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। তুরস্ক, লিবিয়া হয়ে গ্রিস, ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টাকালে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে প্রতি বছর শত শত অভিবাসী প্রাণ হারাচ্ছে। আর কোনোভাবে অভিবাসীরা ইউরোপে ঢুকতে পারলেও তাদের পরিণতি সুখকর হচ্ছে না। তাদের ঠাঁই হচ্ছে বন্দিশিবিরে, বনজঙ্গলে। তাদের সঙ্গে অপরাধীর মতো আচরণ করা হচ্ছে। কঠোর আইনের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে অনেকের জীবন।
গত আগস্টে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক খবরে বলা হয়েছে, গ্রিস সরকার চলতি বছরে হাজারের বেশি আশ্রয় প্রার্থীকে সমুদ্রপথে পুশ ব্যাক করেছে, যেটা খুবই অমানবিক। বছরের শেষদিকে এসে হাজার হাজার শরণার্থী ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে গিয়ে উত্তর ফ্রান্সে আটকা পড়েছে। করোনার কারণে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে পড়েছে। এই তীব্র শীতের মধ্যে উত্তর ফ্রান্সের জঙ্গলে, ব্রিজের নিচে মানুষকে ঘুমাতে হচ্ছে। অথচ তাদের শহরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। যদিও ব্রিটেন এবং ফ্রান্স জানিয়েছে, শরণার্থীদের বিষয়টি মানবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন ফ্রান্সকে শরণার্থীদের সঙ্গে আরো মানবিক আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
ইতালিতে ঢোকার উদ্দেশ্যে তীব্র শীতের মধ্যে বসনিয়ার জঙ্গলে অবস্থান করছে অনেক অভিবাসী। যাদের মধ্যে কিছু বাংলাদেশিও রয়েছে। তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। মেক্সিকো সীমান্তের কাছে নদী পার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে গিয়ে প্রাণ গেছে বহু অভিবাসনপ্রত্যাশীর। এমনকি শিশুদেরকে পরিবার থেকে আলাদা রাখার জন্য কঠোর সমালোচনা হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের।
যেখানে ধনী দেশগুলো শরণার্থীদের অধিকারের ব্যাপারে উদাসীন সেখানে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য লাখ লাখ শরণার্থীর বোঝা বহন করা, মানবিক সহায়তা দেওয়া অনেক বেশি কঠিন। রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে ভাসানচরে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ নিয়ে চলছে নানা সমালোচনা। বিশ্লেষকরা বলছেন, শরণার্থী ইস্যুতে প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা দেশগুলোর বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলোর একচোখা নীতি স্পষ্ট। তারা নিজেরা শরণার্থীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। আবার গরিব দেশে শরণার্থীদের মানবিক অধিকার রক্ষায় সরব হচ্ছে। দ্বিমুখী নীতি না দেখিয়ে রোহিঙ্গাসহ বিশ্বের সব বাস্তুচ্যুত শরণার্থীদের সংকট নিরসন ও মানবিক অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি।
