মেহমুদ রাসেল :খুঁজে ফেরেন শহিদ স্বজন

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৩৪

 ‘মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। একদিকে রয়েছে দেশ গড়ার দায়িত্ব। আরেকটি বড় দায়িত্বও রয়েছে কিন্তু; তা হচ্ছে, যুদ্ধে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের খুঁজে বের করা। তাদের কবরগুলো খুঁজে বের করে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা। এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু দেশের মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। অনেকটা সেই দায়বোধ থেকেই এই কাজ শুরু করি।’ বলছিলেন মোস্তফা-আল-মেহমুদ রাসেল।

গত ১১ বছর ধরে নওগাঁ জেলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি লিপিবদ্ধ করছেন মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের নাম। তিনি খুঁজে বের করছেন গণকবরগুলো। এ কাজে কোনো ক্লান্তি নেই তার। চাকরির সময়টুকু ছাড়া তার ধ্যান-জ্ঞান জুড়ে থাকে এই তথ্য সংগ্রহ।

মুক্তিযুদ্ধ মানে রণাঙ্গনের যুদ্ধ শুধু নয়; জাতির গৌরবময় এই অর্জনের প্রতিটি পাতায় জড়িয়ে রয়েছে আত্মাহুতি আর নৃশংসতারও করুণ ইতিহাস। গণহত্যার বর্বর ইতিহাস। কোটি মানুষের আহাজারি, নারী মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যু। নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া পণ। আর নিরস্ত্র বাঙালির কাছে মৃত্যুই        যেন শক্তি হয়ে উঠেছিল।

রাসেল বলছিলেন, ২০১১ সালে কাজটা শুরু করার পর বুঝতে পারি অনেক দেরি হয়ে গেছে। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী মারা গেছেন। আগামী পাঁচ বছরে হয়তো প্রত্যক্ষদর্শী আর কাউকেই পাওয়া যাবে না। দেখা যাবে, অনেক তথ্যই তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাবে। অথচ বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারে মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানোর বেদনা জড়িয়ে রয়েছে।

মেহমুদ রাসেল জানান, নওগাঁ ও জয়পুরহাট জেলাসংলগ্ন সীমান্তবর্তী গ্রাম পাগলা দেওয়ানে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই এলাকা দিয়েই অনেক শরণার্থী ভারতে যাওয়ার পথে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে ধরা পড়ত। সেখানেই তাদের হত্যা করা হতো। সেই সময় নওগাঁ জেলার নানা প্রান্ত থেকে গরুর গাড়িতে করে শরণার্থীরা আসত সেখানে। সাধারণ হিসাবে দেখা যায়, ৮০ থেকে ৯০ জন গরুর গাড়ির গাড়োয়ানকেই সেখানে হত্যা করা হয়েছে। ঐ স্থান থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে আত্রাইয়ের জালুপোহাতা গ্রামে আট জন গাড়োয়ানের তথ্য পাই, যারা পাগলা দেওয়ান গণহত্যায় শহিদ হয়েছিলেন। ফলে এই তথ্য সংগ্রহ খুব জটিল, সময়সাপেক্ষ বিষয়। কোন মানুষ কোন পরিস্থিতিতে কোথায় গিয়ে যে শহিদ হয়েছেন, তা সময় নিয়ে না মেলালে তার মৃত্যুর কারণ, ঘটনা হারিয়ে যাবে। যাচ্ছেও।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী কতগুলো নৃশংস গণহত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে, তা স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও চিহ্নিত হয়নি। গণহত্যার প্রকৃত তথ্য নিয়ে সরকারি পর্যায়ে হয়নি বস্তুনিষ্ঠ কোনো গবেষণাও। অবশ্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ :দলিলপত্র’ শীর্ষক ১৫ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানেও গণহত্যার ইতিহাস উপেক্ষিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর এলাকায় সংঘটিত সবচেয়ে বড় গণহত্যার তথ্যই ঐ গ্রন্থে স্থান পায়নি।

মেহমুদ রাসেল বলছিলেন, দেশ জুড়ে উগ্রবাদীদের দমনে অনেক কথা বলা হয়। আমার মনে হয়, প্রতিটি গ্রামে যদি বছরের অন্তত একবার সেই গ্রামের গণহত্যার দিনটি স্থানীয়ভাবে স্মরণ করা হয়, তাহলে মানুষ বুঝতে পারত মুক্তিযুদ্ধের নৃশংসতার চিত্র। আমরা বিজয়ের উল্লাস করি। এরচেয়ে বেশি জরুরি মুক্তিযুদ্ধে যাদের প্রাণ গেছে তাদের স্মরণ করা। সেই রক্তক্ষরণ আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। আমরা আর বাংলাদেশ জন্মের মূল প্রেরণা থেকে সরে যাব না।

‘১৯৭১ :গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’-এর উদ্যোগে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় গণহত্যা ও বধ্যভূমি জরিপের কাজ শুরু হয়েছে। তবে সেখানে গবেষক হিসেবে বাইরের গবেষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা বিভিন্ন এলকায় গিয়ে দুই সপ্তাহ করে থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বই প্রকাশ করছেন। কিন্তু এতে তৃণমূলের তথ্য উঠে আসছে না। এই গবেষণা যে খুব একটা কাজে আসছে না, তা পরিষ্কারভাবে ধরা পড়েছে রাসেলের গবেষণায়। যেখানে নওগাঁ শহরে এতদিন ২০ থেকে ৩০টি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেখানে রাসেলের গবেষণায় আরো প্রায় ৭০টি গণকবরের সন্ধান মিলেছে।

মেহমুদ রাসেল জানান, গ্রামের কথা বাদ দিলাম; নওগাঁ শহরেই বেশ কিছু স্থান রয়েছে, যেখানে পাকিস্তানি ও রাজাকারদের টর্চার সেল ছিল, গণকবর ছিল; সেসব স্থানেই ভবন উঠে গেছে, মুছে গেছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। তিনি জানান, নওগাঁ শহরে ব্রিজের পাশে যে যমুনা হোটেল রয়েছে, সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর টর্চার সেল ছিল, পার নওগাঁ পাঠশালা স্কুল, ভবানী ভবনেও অনেক বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। সেসব স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ তো দূরের কথা, সামান্য ফলকও নেই। এই তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করা জরুরি। তা না হলে এসব কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।

‘স্বাধীনতা’ শব্দটি শুধু চারটি বর্ণের সমাহার তো নয়, এর পেছনে আছে লাখো মানুষের দুঃখ-বেদনা, অশ্রু, রক্ত, ক্ষোভ, নির্যাতন আর অপমান এবং অবশ্যই অসম সাহসী লড়াইয়ের উপাখ্যানও জড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহিদ হন, নির্যাতিত হন ২ লাখের বেশি নারী। অথচ এই গণহত্যা নিয়েও রাজনীতি রয়েছে। কেউ কেউ অস্বীকার করে এই গণহত্যাকে। অথচ নতুন করে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, গণহত্যার যে সাধারণ হিসাব আমরা জানতে পাই, তার চেয়েও অনেক বেশি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। তার মানে, হত্যার সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।

মেহমুদ রাসেল তার এই গবেষণার তথ্য নিয়ে গত বছর বই প্রকাশ করেছেন। ‘গণহত্যা ১৯৭১ নওগাঁ’ শীর্ষক গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়েছিল রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন। এরপর তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের নিয়ে আরেকটি গ্রন্থ ‘রক্ত ঋণ ১৯৭১’ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া ‘নওগাঁর বরেণ্য ব্যক্তিত্ব’ নামে সম্প্রতি আরেকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

বই প্রসঙ্গে আলোচনায় রাসেল জানান, প্রথম বইটিতে ৬৭টি গণকবরের তথ্য প্রকাশ করি। এরপর গত এক বছরে আরো ৩৩টি গণকবরের সন্ধান পাই। এই গণকবরের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখি নওগাঁ শহরে মহান মুক্তিযুদ্ধে কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু এসব মানুষের তথ্য সংগ্রহ পুরোপুরি করা সম্ভব হয়নি।

রাসেল নওগাঁ জেলার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে সহকারী প্রশিক্ষক (কম্পিউটার) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। কাজের অবসরে এবং সরকারি ছুটির দিনে তিনি ব্যস্ত থাকেন এই গবেষণার কাজে। এর পাশাপাশি তিনি একুশে পরিষদ, নওগাঁর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, ছিলেন নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি।

অবশ্য এই কাজকে নিজের ব্যক্তিগত অর্জন বলে মানতে নারাজ রাসেল। তিনি বলেন, এটা নওগাঁবাসী সবার সহযোগিতায় সম্ভব হয়েছে। এ ধরনের কাজ একা করা সম্ভব নয়। আমাদের সংগঠন একুশে পরিষদ সামগ্রিকভাবে সহযোগিতা করেছে। বিশেষ করে একুশে পরিষদের সভাপতি ডি এম আব্দুল বারী সব সময় পরামর্শ ও সহযোগিতা করেছেন। একুশে পরিষদের পৃষ্ঠপোষকতায় বইটি প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অমার বন্ধুরা দূরে কোথাও যেতে হলে তাদের মোটরসাইকেলে করে আমাকে নিয়ে যায়। এরকম প্রত্যন্ত অঞ্চলে তথ্য সংগ্রহের জন্য এটাও খুব বড়ো সহযোগিতা।