হাওর, টিলা আর সমতল ভূমিরূপের এক নান্দনিক ও শান্ত সবুজ জনপদ শ্রীমঙ্গল। মুখ্যত চাশিল্পের জন্য অঞ্চলটি দেশে-বিদেশে আদৃত। এই জনপদ, ছোট-বড় পাহাড়ি ছড়া স্বাধীনতাযুদ্ধে রক্তে প্লাবিত হয়েছিল। সিলেট বিভাগের উত্তরপূর্বে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ছিল ৪ নম্বর সেক্টরের অধীন। এখানেই শহিদ হন বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান।
১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিলের পর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শ্রীমঙ্গলে হত্যা করেছিল অর্ধ শতাধিক মুক্তিসেনা ও অসংখ্য নারী-পুরুষকে। হবিগঞ্জ সড়কের পাশে ওয়াপদা রেস্ট হাউস ও ভানুগাছ সড়কে লেবার ওয়েলফেয়ার অফিস ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের দুটি টর্চার সেল। প্রথমটিতে টর্চার করা হতো নারীদের, দ্বিতীয়টিতে পুরুষদের। ৯ মাস ধরে যুদ্ধ চলাকালে শ্রীমঙ্গল শহর ও শহরতলীর কলেজ রোডের শেষপ্রান্তে ভাড়াউড়া চা-বাগান, তত্কালীন বিডিআর ক্যাম্প সংলগ্ন সাধুবাবার বটগাছতলা, সিন্দুরখান, সবুজবাগ ও পূর্বাশাসহ কয়েকটি স্থান হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। জায়গায় জায়গায় হত্যাকাণ্ড চালাত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয় ভাড়াউড়া চা-বাগানে; ৩০ মে ১৯৭১, একসঙ্গে ৫৭ জন চা-শ্রমিককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
শহরের কলেজ সড়কে ভাড়াউড়া চা-বাগানের পাশের বধ্যভূমিতে চা-শ্রমিকদের তাজা রক্ত বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে একটি অনুচ্চ স্মৃতিস্তম্ভ। স্বাধীনতার কয়েক দশক পরেও অনেক বধ্যভূমি অচিহ্নিত ও অসংরক্ষিত রয়েছে। শ্রীমঙ্গল বিজিবি সেক্টর হেড কোয়ার্টারের পাশে ভুড়ভুড়িয়া পাহাড়ি ছড়া ও সাধুবাবার গাছসংলগ্ন বধ্যভূমিকে সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে ২০১০ সালে শ্রীমঙ্গলের বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংস্কৃতিকর্মী ও মুক্তচিন্তক তত্কালীন ১৪ ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক কর্নেল নূরুল হুদার (যিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদ থেকে সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন) নেতৃত্বে ও স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে সুউচ্চ স্মৃতিস্তম্ভ, ঝুলন্ত সেতু নির্মাণসহ বীর শহিদদের স্মৃতি রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে নির্মিত হয় শহিদদের তালিকাখচিত স্তম্ভ, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১’। বর্তমানে বধ্যভূমির পবিত্র এ অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৩ ফুট উঁচু স্মারক স্তম্ভ, বেদি ও দৃষ্টিনন্দন তোরণ নির্মাণের কাজ চলছে। এই বিজয়ের মাসেই নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ছুটির দিনগুলোতে প্রচুর দর্শনার্থী এখানে বেড়াতে আসেন, দেখতে আসেন প্রায় শতবছর বয়সী বটকুঞ্জ ও ‘বধ্যভূমি ৭১’।
প্রসঙ্গত, আজ ৬ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গল মুক্ত দিবস। মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াই আর ভারতের সীমান্ত থেকে মুক্তিবাহিনী ক্রমশ ক্যাম্প অভিমুখে এগিয়ে আসার খবরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে ৬ ডিসেম্বর ভোরের দিকে পালিয়ে তারা মৌলভীবাজারে আশ্রয় নেয়। শ্রীমঙ্গলে ওড়ানো হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
