বাংলাদেশের ইসলামি মৌলবাদীদের সঙ্গে আমি একটা ব্যাপারে এখন সহমত পোষণ করি। ভাস্কর্য ও মূর্তি অভিন্ন। কোনো ভিন্ন ব্যাপার নয়। দুই দিন আগেও আমি মনে করতাম, যেসব মূর্তি পূজার জন্য তৈরি হয় না সেগুলো ভাস্কর্য। আর পূজার জন্য যেগুলো তৈরি হয় সেগুলো মূর্তি। কলকাতার পণ্ডিত যতীন্দ্রনাথ মজুমদার (বাগবাজার) আমার ভুলটি ভেঙেছেন। তিনি আমার লেখা পড়ে লিখেছেন, ‘ভাস্কর্য আর মূর্তি একই কথা। তোমরা মৌলবাদীদের মুখোমুখি মোকাবিলা করতে চাও না বলে ভাস্কর্য কথাটির কৌশলের আড়ালে আত্মরক্ষা করতে চাও। সত্যকে সত্য বলে মানো এবং মৌলবাদীদের মোকাবিলা করো। তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।’
আমি আমার প্রিয় যতীনদার এই কথাটা মেনে নিচ্ছি। ভাস্কর্য ও মূর্তি অভিন্ন কথা; কিন্তু মূর্তি আর দেবতা এক কথা নয়। পূজা করার উদ্দেশ্যে যে মূর্তি বানানো হয় তা দেবমূর্তি বা দেবীমূর্তি। আর শহরের সৌন্দর্য বাড়ানো অথবা কোনো মহাপুরুষের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য যে মূর্তি বানানো হয় তা সাধারণ মূর্তি। সারা উপমহাদেশে অতীতের রাজা-বাদশাদের এরকম অসংখ্য মূর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেগুলোকে কেউ পূজা করে না। অধিকাংশের যত্ন, সংরক্ষণের ব্যবস্থাও নেই। সম্রাট কনিস্কের মূর্তি থেকে কবে কারা তার মাথাটি ভেঙে ফেলেছে। ইতিহাসে সেই মুণ্ডহীন সম্রাটের মূর্তির ছবি আমরা দেখি। তার কাহিনি পাঠ করি।
তুরস্কের রাজধানী ও বিভিন্ন শহরে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের বিশাল মূর্তি। সেই মূর্তি কেউ পূজা করে না। ইরানের রাজধানী তেহরানে রাজা রেজা শাহ পাহলভীর বিশাল মূর্তি ছিল। সেটা বহু বছর পর ভাঙা হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। বাগদাদে প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের বিশাল মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। ইরাকের আলেম সমাজ তাতে আপত্তি করেনি। পরে আমেরিকানরা বাগদাদ দখল করার পর সেই মূর্তি ভেঙেছে। রাজনৈতিক কারণে ভেঙেছে। কোনো ধর্মীয় কারণে নয়। পোলান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে লেলিনের ২২ ফুট উঁচু বিশাল মূর্তি ছিল। কমিউনিস্ট সরকারের পতনের পর সেই মূর্তি মার্কিন সিআইএর এজেন্টরা ভেঙে ফেলেছিল। লেলিনের মূর্তিও ওয়ারশতে ভাঙা হয়েছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য। কোনো ধর্মীয় কারণে নয়।
বাংলাদেশে এখন হেফাজতিরা যে মূর্তিবিরোধী অভিযানে নেমেছে তা রাজনৈতিক কারণে। কোনো ধর্মীয় কারণে নয়। হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমিরের মৃত্যুর পর নতুন আমির হয়েছেন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। তিনি আগে থেকেই উগ্রপন্থি হিসেবে পরিচিত। তিনি সাবেক আমির আল্লামা শফির মতো মধ্যপন্থি এবং জামায়াতবিরোধী নন। বরং উগ্রবাদী এবং জামায়াতপন্থি। তার নেতৃত্বে উগ্রবাদীরা হেফাজত দখল করার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মূর্তি প্রতিষ্ঠাকে ইস্যু করে সরকারবিরোধী কট্টর জনমত তৈরি করার চেষ্টা করছেন। এটার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। কোনো ধর্মীয় কারণ এর পেছনে নেই।
খবরটা কতটা সত্য এখন পর্যন্ত জানি না। হেফাজতিরা দেশ থেকে সব মূর্তি উত্খাত করা হবে—এই হুমকি দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন গরম করে তোলার পর স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষের সাংস্কৃতিক ও যুব-জনতা যখন তাদের হুমকির জবাবে মাঠে নেমেছে তখন তারা নাকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসার আর্জি পেশ করেছেন। খবরটা সঠিক হলে বলব, তাদের মূর্তিসম্পর্কিত বক্তব্য সত্ ও ধর্মভিত্তিক হলে তারা হুমকি দেওয়ার বদলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আগে আলোচনার জন্য বৈঠকে বসতেন। তা না করে হুংকার দিয়ে মাঠে নেমে প্রতিপক্ষ প্রগতির শিবির অতীতের শাহবাগ চত্বরের মতো প্রস্তুত দেখে এখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসে মুখ বাঁচাতে চাইছেন। তাদের মূর্তিবিরোধী অভিযান যে ধর্মীয় কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
বিএনপি চরিত্রগতভাবে সাম্প্রদায়িক, জামায়াত ধর্মান্ধ এবং আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসী দল হিসেবে পরিচিত। আল্লামা শফির নেতৃত্বে হেফাজত ছিল একটি ধর্মীয় দল। বাবুনগরীর নেতৃত্বে এটিও ধর্মান্ধ দলে পরিণত হতে যাচ্ছে। ফলে এদের মধ্যে মিলনটা স্বাভাবিক। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার মতো এদের হাতে কোনো ইস্যু নেই। জনসাধারণের কাছে তাদের কোনো ক্রেডিবিলিটিও নেই। বিএনপি সম্প্রতি দেশে সরকারবিরোধী প্রতিবাদ দিবস ডেকে দেখেছে, মাঠের একটি ঘাসও তাতে সাড়া দেয় না। তাই ভাস্কর্য বা মূর্তি নিয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে এই উত্তেজনা সৃষ্টি করে সেটিকে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দাঁড় করানোর এই অপচেষ্টা। এই উত্তেজনাকে গোলযোগে পরিণত করার জন্য তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাত্তরের এক শহিদের মূর্তির ক্ষতি করেছে। আরো খবর পেয়েছি, কুষ্টিয়াতে তারা বঙ্গবন্ধুর মূর্তির ক্ষতি করেছে। জনতা জাগ্রত হতেই এখন তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসে আত্মরক্ষা করতে চাইছে।
নইলে এই হেফাজতিরাও জানেন, মূর্তি আর দেবদেবীর মূর্তি এক কথা নয়। ইসলাম যেমন পূজার জন্য দেবদেবীর মূর্তি তৈরি নিষেধ করেছে, তেমনি ছবি তৈরিও নিষেধ করেছিল; কিন্তু এখন রাজরাজড়ার ছবিতে সব মুসলিম দেশ, এমনকি সৌদি আরবও সয়লাব। টাকার নোটে সৌদি বাদশার ছবি। ঘরে ঘরে তার ছবি। এগুলো পূজা করার উদ্দেশ্যে তোলা ছবি নয়। সুতরাং কোনো মুসলিম দেশেই তা নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ নয় সাধারণ মূর্তি নির্মাণও। মানুষের মূর্তি ও দেবতার মূর্তির মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল।
লন্ডনের রাস্তাতো বড় বড় বীর ও নেতাদের মূর্তিতে ভর্তি। কই, যে লাখ লাখ মুসলমান ব্রিটেনে বসবাস করেন, তাতে তাদের কেউ বলেননি তাদের ইমান-আমান কোনোভাবে নষ্ট হয়েছে। দোহা, কুয়েত বা কাতারে যেতে তাদের বিমানবন্দরে নামলে দেখা যাবে, বিমানবন্দর থেকে রাজধানী শহরে পৌঁছা পর্যন্ত শাসক শেখ বা সুলতানের লাইফ সাইজ ছবি (অনেকটা মূর্তির মতোই), রাস্তার দুই পাশে দাঁড় করানো। তা নিয়ে সেদেশের আলেমউলেমারা কোনো কথা বলেছেন বলে শুনিনি। মনে হয় ইসলামের সোল এজেন্সি নিয়েছেন বাংলাদেশের জামায়াতি ও হেফাজতি আলেমরা।
একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, বিশ্বের বহু দেশে মূর্তি ভাঙার যে কালচার গড়ে উঠেছে, তার উদ্দেশ্য ধর্মীয় নয়, তা স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক। যে কোনো ধর্ম ও তত্ত্বের উগ্রবাদীরাই তাদের ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ শুরু করেন মূর্তি ও স্থাপত্য ভাঙা দ্বারা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদারেরা তাদের গণহত্যা শুরু করে ছিল একুশের ভাষাশহিদদের স্মরণে নির্মিত শহিদ মিনার গোলাবর্ষণ করে ভাঙার দ্বারা। জামায়াতিরা এই শহিদ মিনারকেও পৌত্তলিকতা বলে নিন্দা করেছিল। পঞ্চশের দশকের গোড়ায় যখন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি উগ্রপন্থিরা দখল করে তখন তারা মার্কসবাদকে বিকৃত করে ফতোয়া দেয় বুর্জোয়াদের সব মূর্তি ভেঙে ফেলতে হবে। তদনুযায়ী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে হারডাঙা হলে স্থাপিত বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায় প্রমুখ মনীষীর এমনকি রবীন্দ্রনাথের মূর্তি তারা ভেঙে ফেলে। কমিউনিস্টদের এই কার্যকলাপকে তখন অনেকে ‘ভারতে সভ্যতার সংকট’ আখ্যা দিয়েছিলেন। অবশ্য এই সংকট ভারত তথা পশ্চিবঙ্গ এখন কাটিয়ে উঠেছে। মনীষীদের মূর্তিগুলো পুনঃ স্থপিত হয়েছে। পরাজিত হয়েছে উগ্রপন্থি কমিউনিস্টরা। তাদের হিংসাত্মক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশেও উগ্রপন্থি মৌলবাদীরা সাময়িকভাবে হলেও সভ্যতার সংকট সৃষ্টি করতে চাইছেন খুবই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাত্তারের শহিদ মধুসূদন দের মূর্তি ভেঙে তারা ধর্মের বিধানকে সম্মান দেখাননি। তাদের অজ্ঞতা অন্ধত্বের যেমন পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি একাত্তরের মহান যুদ্ধকেও অসম্মাননা করেছেন। মধুসূদন দে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতকের ছাত্র-শিক্ষকের প্রিয় মধুদা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই মধুদার স্মৃতি জড়িত। মূর্তির ক্ষতি করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি তার স্মৃতি নষ্ট করতে পারবে না।
কুষ্টিয়ায় জাতির পিতার নির্মীয়মাণ মূর্তির ক্ষতি করার ধৃষ্টতা যারা দেখিয়েছে, তাদের সেই ধৃষ্টতা ক্ষমার যোগ্য নয়। তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। নইলে আজ তারা বঙ্গবন্ধুর মূর্তিতে হাত দিয়েছে, কাল তার আদর্শ উত্পাটনের কাজে হাত দেবে।
আওয়ামী লীগ নেতাদের আমি শুধু একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিই। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ অসমাপ্ত রয়ে গেছে। তার সমাপ্তির যুদ্ধ এখন সামনে এসেছে। স্বাধীনতার পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে তারা যদি একাত্তরের মতো আবার রুখে না দাঁড়ান, তাহলে বিরাট ভুল করবেন।
n লন্ডন, ৫ ডিসেম্বর, শনিবার ২০২০
