নিরাপদ খাদ্য, ভোক্তা অধিকার ও বর্তমান সমাজ

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:০৯

বাংলাদেশসহ বর্তমান বিশ্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করা। ভেজালমুক্ত খাদ্য জনগণকে সরবরাহ করাই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ, দিনকে দিন ভেজাল খাদ্যের পরিমাণ এত পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে যে, সেটা এখন সীমাহীন ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভেজালকে বলা হয় জাতি ধ্বংসের সূক্ষ্ম কারিগর। কারণ, মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অন্ন। অর্থাত্ জনগণকে নিরাপদ অন্ন সরবরাহ করা রাষ্ট্রের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। জনগণ যদি শুদ্ধ খাদ্য না পায়, তবে আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম অসুস্থতার সহিত বেড়ে উঠবে। আর এভাবে একটি জাতির ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। কিন্তু ইদানীং আমরা লক্ষ করছি এই ভেজালের পরিমাণ সমাজে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে এর পরিমাণটা বেশি। এ দেশে এমন কোনো খাদ্য অবশিষ্ট নেই, যার মধ্যে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভেজাল মেশায়নি! চাল, ডিম, মাংস, মাছ থেকে শুরু করে সমস্ত মশলা, ফল—সব জায়গায় ভেজাল।

কিন্তু স্বাধীনতার এই এত বছর পরে এসে বাংলাদেশে খাদ্য নিয়ে এমন ভেজাল কি আমাদের কাম্য ছিল? অবশ্যই না। জনগণের মৌলিক চাহিদায় যদি ভেজাল থাকে, তাহলে বাকি সবকিছুতে এর নেতিবাচক প্রভাব আসবে—এটাই স্বাভাবিক। আমরা যদি একটি সুস্থ, সুন্দর ভবিষ্যত্ প্রজন্ম কামনা করি তবে খাদ্যে ভেজাল বন্ধ করতে হবে এবং জনগণকে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। সমাজ থেকে এই ভেজালযুক্ত খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করতে হলে সমাজের সব পক্ষের মিলিত কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন সেই পদক্ষেপগুলো নিয়ে আলোকপাত করা যাক।

প্রথমত, সরকারকে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধে যে আইন আছে, সেটার কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে বা এই আইনে যদি কোনো ফাঁকফোকর থাকে, তবে সেটা বিশ্লেষণ করে আইন সংশোধন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত,  যারা ভেজাল খাদ্য বিক্রি করে, এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।

তৃতীয়ত,  আমাদের সমাজের বণিক সমিতিকে এ বিষয়ে আরো কার্যকর হতে হবে। তাদের মধ্যে যারা ভেজাল খাদ্য বিক্রয় করে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের ব্যবসায় বন্ধ করে দিতে হবে।

পঞ্চমত, সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সভা, সেমিনার, টিভিতে বিজ্ঞাপন বা পাঠ্যপুস্তকে ভেজালবিরোধী পাঠ্যক্রম যুক্ত করতে হবে। দেশের প্রতিটি থানা, উপজেলা, জেলাতে সভা, সেমিনার করতে হবে। ভেজালের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে হবে এবং জনগণকে এ বিষয়ে সাবধান করতে হবে।

ষষ্ঠত, নিজেদের মাঝে ধর্মীয় মূল্যবোধ, পারিবারিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ, ব্যক্তি নিজে যদি সঠিক পথে না আসে তবে দেশে যতই আইন থাকুক না কেন সে ঠিকই এর ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে আসবে। তাই আমাদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে। কারণ, কোনো ধর্মই অনৈতিক, অবৈধ কাজ করতে বলে না।

ফরমালিনযুক্ত খাবার খেলে শিশু প্রতিবন্ধী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক। একটি জাতিকে বিকলাঙ্গ করে ফেলে এই ভেজাল। এটি হচ্ছে একটি সুপ্ত জীবননাশক বিষ। যেটা আপনাকে একটু একটু করে শেষ করে দেবে। তাই ভেজাল থেকে দূরে থাকতে হবে, কৃষকদেরও ন্যায্যমূল্য দিতে হবে, ব্যবসায়ীদেরও সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে, যেন তারা ভেজালের পথে না যান। সুস্থ, সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে ভেজালকে দূর করতে হবে। কোনো দেশপ্রেমিক কেউ এই ভেজালের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে না। যারা ভেজালের সঙ্গে সম্পর্কিত এরা দেশের শত্রু, রাষ্ট্রের শত্রু। আর এসব শক্রুদের থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। ভোক্তাকে সঠিক মূল্যে পণ্য ক্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। ভেজালমুক্ত সমাজই পারে যে কোনো একটি দেশকে মেধাবী প্রজন্ম উপহার দিতে। তাই আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত, ‘ভেজালকে পরিহার করি, সুস্থ, স্বাভাবিক দেশ গড়ি’।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়