কেমন বাংলাদেশ চাই

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:১১

স্বাধীন দেশের বাসিন্দা হয়ে একজন মুক্তমনের নাগরিক হিসেবে দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার অধিকার প্রতিটি মানুষের আছে। তাই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমারও নিজস্ব কিছু চাওয়া ও ভাবনা আছে। আমি মনে করি, এগুলো সামগ্রিক তরুণ সমাজেরই ভাবনা। আমি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রতিটি তরুণ-তরুণীর অগ্রসরতা নির্ভর করবে তাদের যোগ্যতা ও মেধার ওপর। আমি এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা করি, যেখানে সবুজের ওপর নিশ্চিন্তভাবে দেশের প্রতিটি মানুষ হেঁটে বেড়াবে। স্বপ্ন দেখি, মানুষের নিরাপত্তায় আমার দেশ প্রথম, যেখানে একাকী রমণী নির্জন পথে চলবে, থাকবে না ধর্ষিত হওয়ার আতঙ্ক। স্বপ্ন দেখি, সবুজ একটা পাসপোর্ট থাকবে, যেটি নিয়ে ভ্রমণ করে আসতে পারব পৃথিবীর সর্বত্র। আমি দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সন্ত্রাস, খুন, রাহাজানি, ঘুষ, নেপোটিজম, বৈষম্য, ভেজাল খাদ্য, মাদক, যানজট ও কুরুচিপূর্ণ রাজনীতিমুক্ত একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ চাই; যেখানে প্রাণভরে তৃপ্তিসহকারে নিঃশ্বাস নিতে পারব। যেখানে আর ক্ষুধিতের কান্না শোনা যাবে না, পথশিশুর মুখে থাকবে হাসি, বিনা অপরাধে কোনো দুঃখিনী মায়ের বুক হবে না খালি। আমি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, কোনো শিক্ষককে মাত্র ৫ হাজার ৫০০ টাকার জন্য বসতে হবে না ফুটপাতে। শিক্ষকেরা হলেন মানুষ গড়ার কারিগর, তাদের সম্মান থাকবে সবার ওপরে, যেখানে প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি থাকবে, প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব সংস্কৃতিকে নিজের মধ্যে লালন করবে এবং প্রত্যেকের জন্য থাকবে সব সুযোগ-সুবিধায় সাম্য। যে দেশের মানুষের একতা ও দেশপ্রেম হবে উন্নয়নের মূল হাতিয়ার।

স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান কখনোই সুখকর নয়। আর এটি যদি একটি দেশের ক্ষেত্রে হয়, তাহলে তো ব্যাপারটা আরো দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। আমি জানি একটি দেশকে কখনোই সব দিক দিয়ে পঙ্কিলমুক্ত করা সম্ভব নয়। কোথাও না কোথাও একটু কাদা লেপটে থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। তবে আমি মনে করি, একটি দেশ আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব, যদি সেই দেশের শাসনব্যবস্থা নিষ্ঠার সঙ্গে দক্ষভাবে পরিচালনা করা হয়। যদি শাসনকাঠামোতে দুর্নীতি নামক জঘন্যতম ব্যাধি না থাকে। দুর্নীতির কথাটা মনে পড়তেই আমি কেমন বাংলাদেশ চাই—এই স্বপ্নকে কেমন যেন আমার নিজের কাছেই প্রহসন বলে মনে হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যা থেকে উঠে আসা কঠিন। যারা দেশকে পরিচালন, নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষা করবে; তারাই ঘুষ, জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হচ্ছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সব পদ চলে যাচ্ছে অযোগ্য ও নীতিভ্রষ্টদের নিয়ন্ত্রণে। এভাবেই চাকরি, চিকিত্সা, শিক্ষা, উন্নয়ন, নিরাপত্তাসহ সব স্তরে ঢুকে যাচ্ছে দুর্নীতি, যেটা থেকে উঠে আসা খুবই জরুরি।

যে দেশ লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জন করেছিল স্বাধীনতা, বিশ্বদরবারে হয়েছিল সম্মানিত, মহিমান্বিত; আজ সেই দেশের কী করুণ অবস্থা! খবরের কাগজের পাতা উলটালেই দেখা যায় অহরহ খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, রডের বদলে বাঁশ দিয়ে স্থাপনা করে হাজার প্রাণকে বিপন্নের মুখে ধাবিত করছে এমন আরো শত শত নেতিবাচক খবর। এগুলো সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের দ্বারায়ই সম্পাদিত হচ্ছে। তারা নিজেদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থকে বড় করে দেখে, যার ফলাফল ভোগ করতে হয় নিরীহ সাধারণ জনগণকে। বঙ্গবন্ধু আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতার পরে সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি। এত চোরের চোর। পাকিস্তানিরা সবই নিয়ে গেছে, চোরগুলোকে নিয়ে গেলে বাঁচতাম।’ তিনি ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ এটাও বলেছিলেন, ‘কারা দুর্নীতি করে? আমার কৃষক, আমার শ্রমিক দুর্নীতি করে না। দুর্নীতি করে ঐ শ্রেণীর মানুষ, যারা কোর্ট-প্যান্ট-শার্ট পরে।’

জীবনানন্দ দাশ বলছিলেন, ‘পৃথিবীর এখন গভীর গভীরতা অসুখ’। কথাটা যেমন বর্তমান প্রেক্ষাপটে করোনার ক্ষেত্রে সঠিক, তেমনি মানুষের নীতিনৈতিকতা, মনুষ্যত্ব যে পরিমাণ বিবর্জিত হয়েছে, সে ক্ষেত্রেও একদম যথার্থ। সোনার বাংলা গড়তে হলে তো সোনার মতোই মানুষ দরকার। বর্তমান সময়ে সোনার মানুষ আর কোথায়? প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক ডায়োজিনিস। তিনি একদিন দিনের বেলায় বাতি নিয়ে বাজারে উপস্থিত হলেন, সবাই তাকে জিগ্যেস করল, তুমি কি পাগল হয়ে গেলে যে দিবালোক চলছে আর তুমি বাতি নিয়ে ঘুরছ? তিনি উত্তরে বলছিলেন, আমি মানুষ তো দেখছি, কিন্তু আসল মানুষ তো নেই, আমি আসল মানুষকে খুঁজছি। আমি তো সব অন্ধকার দেখছি।’

১৯৭১ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে বলেছিলেন, ‘বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বসবাস করবে, খেয়ে-পরে সুখে থাকবে এবং বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে।’ আমিও ঠিক এমন একটি বাংলাদেশই চাই।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া