আসলেই কি প্রণোদনা?

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:২৭

করোনার প্রভাব কাটাতে সরকারঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ কি সত্যিই প্রণোদনা? করোনার অভিঘাত মোকাবিলায় এটি খুব একটা কার্যকর হয়েছে বলে মনে করছেন না উদ্যোক্তা কিংবা বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিংবা হ্রাসকৃত সুদে এই প্যাকেজ দেওয়া হলেও কার্যত এর মাধ্যমে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী শ্রেণি ছাড়াও সাধারণ জনগণ তথা যারা ক্রেতা-ভোক্তা, তাদের জন্যও বিশেষ কোনো কর্মসূচি নেই। যে কারণে বলা হচ্ছে, এই প্রণোদনা ফলপ্রসূ হয়নি। তদুপরি, এটি আসলে প্রণোদনা নয়। সাময়িক এবং কিছু হ্রাসকৃত সুদে এটি ঋণই বটে। অনেকেই ব্যাবসায়িক মন্দায় ব্যাংকের কিস্তি দিতে পারছেন না। তাদের আবার বাড়তি ঋণ জুগিয়ে বরং ব্যাংকেরই অনাদায়ি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এখন যেভাবে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তা প্রণোদনা হচ্ছে না। সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। সরকার যদি বাজেট থেকে অনুদান দেয়, তাহলে সেটাই হবে মূল প্রণোদনা। এখন ব্যাংক থেকে যে ঋণ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সরকারের মাথা ঘামানো উচিত নয়। এসব ঋণের অনেকটা খেলাপি হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাবেক এই ব্যাংকার।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা চলছে। সরকারের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কলকারখানা চালু রাখলেও ক্রেতাদের আয় কমে যাওয়ায় পণ্য বিক্রি কমেছে। এ অবস্থায় ঋণ পরিশোধে   সময় বর্ধিতকরণের দাবি জানিয়ে উদ্যোক্তারা বলেছেন, অতীতেও ক্ষেত্রেবিশেষে ঋণ পরিশোধে লম্বা সময় দেওয়া হয়েছিল। অনেক উদ্যোক্তাই এই সুবিধা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কিস্তি পরিশোধ করেছেন। কিস্তির আকারও তাতে ছোট ছিল। এবারের করোনা সবার ক্ষেত্রেই নেতিবাচক হয়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধে সময়সীমা বাড়িয়ে দিলে উদ্যোক্তা যেমন বাঁচবে, ব্যাংকও আটকা পড়বে না। ব্যাংকের বিনিয়োগের টাকা ফেরতে এটিই হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপ।

তাদের মতে, স্টিমুলাস প্যাকেজের সুবিধা পেয়েছে শুধু উদ্যোক্তাদের একটি অংশ। এটি আপত্কালীন ঋণ হওয়ায় অনেকেই আবার ফেরত দিতে না পারার শঙ্কায় সুযোগটি গ্রহণ করেনি। ফেরতের শর্তে স্বল্প সময়ের জন্য এই ঋণ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য সহায়ক নয় বলে কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জন ব্যাংক কর্মকর্তাও বলেছেন, করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা সামলাতে না পারলে মাঠ থেকে প্রণোদনার ঋণের টাকা উদ্ধার করাও চ্যালেঞ্জ হবে। তার মানে, ব্যাংক-গ্রাহক উভয়ের জন্যই এটি গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এদিকে সাধারণ জনগণের জন্য কার্যকর কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ নেই। চাকরি হারিয়ে যারা ক্রয়সামর্থ্য হারিয়েছেন, তাদের টিকে থাকার বিষয়টিও উপেক্ষিত, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে সাধারণের জন্যও নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের কিস্তি প্রদানে শিথিলতা রয়েছে। এই সময় পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধ না করলে গ্রাহক খেলাপি হবেন না। প্রশ্ন হচ্ছে, করোনার থাবায় যখন বাণিজ্য নাকাল, তখন কিস্তি পরিশোধ করবেন কীভাবে? শুধু খেলাপি না করার কারণে সময় বাড়িয়ে উদ্যোক্তার কোনো লাভ হচ্ছে না। বরং সামগ্রিকভাবে ঋণ পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দিলে অন্তত ব্যাংক নিয়ে উদ্যোক্তাকে ঝামেলায় পড়তে হতো না। 

এই দাবিকে যৌক্তিক বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এই সময়ে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায়ে নমনীয় হতে হবে। ব্যবসায়ীদের সুযোগ দিতে হবে, যাতে কলকারখানা চালু রাখা যায়। কর্মসংস্থান ঠিক রাখা যায়। সবকিছু কঠিন করে ফেললে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা পূরণ হবে না। অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, এই সংকটময় সময়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে ক্রেতা, ভোক্তা ও উত্পাদক—সবার হাতেই টাকার প্রবাহ বাড়াতে হবে। উন্নত দেশগুলো প্রত্যেক নাগরিককেই আর্থিক সুবিধা দিয়েছে। জীবিকার সংকটকালে জীবন বাঁচিয়ে রাখতে নগদ অর্থসহায়তার বিকল্প নেই।

প্রসঙ্গত, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার ১৯টি প্যাকেজের আওতায় ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করে। কিন্তু ক্রেতাদের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতকেই প্রাধান্য দিয়ে উত্পাদক ও ভোক্তা সবার হাতে নগদ অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশে এখনো সেই রকম সার্বজনীন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।