বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ও রিজার্ভ ফরেস্ট সিলেটের রাতারগুল। সারা বছরই এই জলার বনে পর্যটকদের আগমন ঘটে। প্রাকৃতিক এ জলাভূমিকে ১৯৫২ সালে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করে বন বিভাগ। এখানে বর্ষায় জলে ভাসা নানা প্রজাতির গাছ-গাছালি ও লতাগুল্মের নয়নকাড়া দৃশ্য যে কাউকে মুগ্ধ করে। তবে সেই নয়নাভিরাম জলাভূমি এখন বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির মাছের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। এতে তীরবর্তী জেলে সম্প্রদায়সহ খেটে খাওয়া মানুষের আর্থ-সামজিক অবস্থা বদলাচ্ছে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশেষ উদ্যোগে শতাধিক নারী-পুরুষের ভাগ্যের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো।
সরেজমিনে গেলে এলাকার বসিন্দরা জানান, রাতারগুল জলার বনটিতে একসময় তারা কাঠ কাটতেন ও লাকড়ি কুড়াতেন। ধরে আনা মাছ বাজারে বিক্রি করলেও সংসারের তেমন উন্নতি ছিল না। এখন পরিকল্পিত উপায়ে মাছ চাষের ফলে মাছের উত্পাদন বেড়েছে। সপ্তাহান্তে মাছ বিক্রির টাকায় চলছে সংসার। শুধু তাই নয়, মাছ বিক্রির টাকা সঞ্চয় করে কেউ ছাগল, কেউ সেলাই মেশিন, কেউ বা ভিটামাটি কিনেছেন।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) মত্স্য বিজ্ঞান অনুষদের জলজসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রফেসর ড. মৃত্যুঞ্জয় কুন্ড বলেন, ‘দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার প্রেক্ষিতে রাতারগুলে অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়। তীরবর্তী জেলেরা প্রজনন মৌসুমে যাতে মাছ ধরতে ও বিক্রি করতে না পারেন—সে জন্য জেলেদের নিয়ে খাঁচার মধ্যে তেলাপিয়া, পাবদা, মাগুর মাছ চাষ করি। সেই মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে তারা প্রয়োজন মেটান।’ তিনি বলেন, খুবই পুষ্টিসমৃদ্ধ মলা-ডেলাসহ বিলুপ্ত প্রায় মাছ রক্ষা জরুরি। তাই ‘পেন’ কালচারের মাধ্যমে এগুলো চাষ করে মুক্ত জলাশয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে হাওরে দারুণ ভাবে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
জানা গেছে, ২০১৭ সালে এই অঞ্চলে ব্যাপক হারে মাছের মড়ক দেখা দেওয়ার পর ভাবনায় আসে বিলুপ্তপ্রায় মাছগুলোকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়। সেই কারণে বিলুপ্ত প্রজাতির দেশীয় মাছের উত্পাদন, সংরক্ষণ ও বিস্তার, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মত্স্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে ২০১৮ সালে রাতারগুল জলার বনে কাজ শুরু করে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের আওতায় এনএটিপিফেজ-২ প্রকল্পের অর্থায়নে প্রফেসর ড. মৃত্যুঞ্জয় কুন্ড এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ড. ফয়সাল আহমেদের নেতৃত্বে সিলেটের সারি-গোয়াইননদী ও তত্সংলগ্ন হাওর ও বিলসমূহে দেশীয় মাছের বংশবৃদ্ধির জন্য গবেষণা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পের অংশ হিসেবে রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টে ও গুরকচি নদীতে প্রায় তিন একর জায়গায় অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়। গুরকচি অভয়াশ্রমের ৫০ জন এবং রাতারগুলে ৩০ জন মত্স্যজীবীকে নিয়ে গঠন করা হয় অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা কমিটি। এরপরই এ প্রকল্পের সুফল পেতে শুরু করেন এলাকার জেলে ও সাধারণ মানুষ।
প্রফেসর ড. ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘এলাকায় কো-ম্যানেজম্যান্টের মাধ্যমে এই অভয়াশ্রম তৈরি হয়েছে। তারা খাঁচায় মাছ ধরা শিখেছে। তাদের আর্থ-সামজিক অবস্থার উন্নয়ন হয়েছে। খাঁচার মাছের টাকা দিয়েই বিকল্প আয়ের পথ বের করেছেন তারা। প্রজনন মৌসুমে মাছ না ধরায় তাদের জীবনমানেরও পরিবর্তন এসেছে। এখন এটাকে ধরে রাখতে হবে।’
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানালেন, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের ১টি বিলে ও গুরকচি নদীতে অভয়াশ্রম তৈরি করে পাশে জাল ও বাঁশ পুতে স্থাপিত ‘পেন’-এ ডিমওয়ালা দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করে প্রজনন মৌসুম এপ্রিল ও মে দুইমাস পরিচর্যা করা হয়। জুন মাসে ‘পেন’গুলো উন্মুক্ত করে দিলে বর্ষায় আশপাশের জলাশয়ে মাছে ভরে উঠে। রাতারগুলের ষাটোর্ধ্ব জেলে আকবর বলেন, গত ২০ বছরেও এমন মাছ দেখিনি। এখন যা দেখছি। তিনি জানান, ঘোড়া, খারি, নানিদ, বড় চিতল, চিতলের বাচ্চাও পাওয়া যাচ্ছে।
রাতারগুল অভয়াশ্রমে দেশীয় জাতের মাছ চাষ প্রকল্পটি আগামী বছর জুনে শেষ হওয়ার কথা। তবে প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধি করে এটিকে উন্নতমানের ও আদর্শ অভায়াশ্রম তৈরির লক্ষ্যে খাল খননসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করার কথা জানালেন জেলেসহ স্থানীয়রা। গুরকচি মত্স্যজীবী সমবায় সমিতির অর্চনা দাসসহ এলাকার উপকারভোগী কয়েক জন নর-নারী জানালেন, প্রকল্পটি চালুর পর তারা এখানে নতুন ভাবে বাঁচতে শিখেছেন।
